রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

অবক্ষয়ই একমাত্র সত্য নয়, সত্যের আলো সন্নিকটে রয়: এম এ কবীর

প্রকাশের সময় : ৫ অক্টোবর, ২০২০ ১২:৩০ : অপরাহ্ণ

‘অন্ধকার আর অবক্ষয়ই একমাত্র সত্য নয়
সত্যের আলো অতি-সন্নিকটেই রয়’
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্যায় পরিহার করে, সত্যের পালে জোর হাওয়া দেবে, সেভাবেই ওদের তৈরি করতে চেষ্টা করা দরকার। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হলো তার মনুষ্যত্ব, মানবিকবোধ সম্পন্ন বিবেক ও বুদ্ধি। শিক্ষা মানুষকে মানবিকবোধ সম্পন্ন জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই কিন্তু সুশিক্ষায় শিক্ষিত মানবিক মানুষের অভাব দারুনভাবে। অফিস-আদালত,ব্যাংক,দপ্তর-অধিদপ্তরসহ প্রশাসনিক ক্ষেত্রগুলোতে দূর্নীতিতে সয়লাব। আর এসব অন্যায়কারী সবাই বড় বড় ডিগ্রিধারী। অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিতের চেয়ে উচ্চশিক্ষিতের অপরাধের পাল্লা ভারি। এদেরকে কী আদৌ শিক্ষিত বলা যায়? এসব শিক্ষিতদের কাছ থেকে ভালকিছু কতটুকুই বা আশা করা যায়?  একজন মানুষ শিক্ষিত হওয়ার চেয়েও ভালো মানুষ হওয়া খুব বেশি প্রয়োজন।

কথায় আছে, দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।

হার্বাট রিড বলেছেন,

মানুষকে মানুষ করাই হলো শিক্ষা।

‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা
খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি
দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার
ফুল কিনে নিও, হে অনুরাগী।’

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রায় ১৫০ বছর আগে মানুষের ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তির পাশাপাশি হৃদয়–মনের ক্ষুধা নাশের জন্য একটু বাজে খরচের উপদেশ দিয়ে গেছেন। সে সময়ের আরেক সাহিত্যিক নাকি বিলেত থেকে কোটের বোতাম আনিয়ে পরিধেয় দৃষ্টিনন্দন করে গড়তেন। আর ঠাকুরবাড়ির শখ-শৌখিনতা নতুন করে উল্লেখ বাতুলতামাত্র। সাঁওতাল মেয়েটি কানে ক্যামেলিয়া গুঁজে ‘ডেকেছিস কেনে? আমি বললেম ‘এই জন্যেই’ বলে যে অসাধারণ কবিতাটি রবি ঠাকুর শেষ করেছেন, সেখানেও কালো রূপকে আলোদান করতে একটি ফুলের শিল্পমহিমার জয়গান আছে। এই যে প্রয়োজনের বাইরে অপ্রয়োজনের জন্য মানুষের ছটফটানি, এরই অপর নাম কি ভোগবাদিতা?

শিক্ষিত হয়েও মানুষ হতে না পারলে এ শিক্ষা মূল্যহীন।
আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জনকেই শিক্ষা বলে অভিহিত করেছেন দার্শনিক কান্ট।

সমাজের ইতিবাচক বিকাশের জন্য প্রয়োজন আদর্শ ও মনুষ্যত্ব বোধসম্পন্ন মানুষ। একটি উন্নয়নশীল দেশের পূর্বশর্ত নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ। দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ তৈরি হচ্ছে খুব কম। বাংলাদেশে পুঁথিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়ছে। তবে সুশিক্ষার প্রসার হচ্ছে না।

হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বিশ^াস করে এবং মানুষকে ভালোবাসে, সে প্রকৃত মুসলমান।’ অর্থাৎ এমন এক মানুষের কথা বলা হয়েছে, যার অন্তরে থাকবে পরস্পরের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস।হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ^র।’ অর্থাৎ তার মতে প্রাণ মাত্রই ঈশ^রের সমতুল্য। কিন্তু বর্তমান মানবসমাজের অমানবিক পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে। একটু বয়সী পুরুষদের কেউ কেউ এখনো বলেন, ‘জীবন হবে সাদামাটা, চিন্তা হবে বড়’। যাঁরা এমন কথা এখন বলেন, তাঁরাও তারুণ্যে সেফার্স ঝরনা কলম ব্যবহার করেছেন, গিলে করা পাঞ্জাবি পরেছেন, কাশ্মীরি শাল গায়ে না জড়িয়ে ঘাড়ের ওপর আলতো করে ফেলে রেখেছেন, বিদেশ থেকে রোলেক্স ঘড়ি আনিয়েছেন। বয়সভেদে ভোগের তারতম্য ঘটে।যৌবনে ব্যক্তিসৌন্দর্য বাড়াতে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের যে বাহুল্য থাকে,পরিণত বয়সে তার ধরন পাল্টায়। তখন অভিজাত এলাকায় ভালো বাড়ি, দামি গাড়ি, ধনী বৈবাহিকী, বিদেশে সেকেন্ড হোম ইত্যাদির দিকে ধাবিত হতে থাকে। তাঁদের ভোগবাদিতার দিকে আঙুল তুললে তাঁরা আবার মনীষীদের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, ‘যে জীবনে কোনো অগ্রগতি নেই, সে জীবন অবাঞ্ছিত’।এই অগ্রগতি ত্রিকালদর্শীদের কাছে মানসিক উত্তরণ বোঝালেও বাস্তবে বৈষয়িক উন্নতিরই নামান্তর।শিক্ষিত হওয়া আর মনুষ্যত্ব অর্জন করা এক কথা নয়, দুটো সম্পূর্ণই ভিন্ন। আমরা পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করতে পারছি তবে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারছি না।মানুষই একমাত্র জীব যার মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য চর্চার প্রয়োজন হয়। মনুষ্যত্ব অর্জনের চর্চাটাই সমাজে তথা পরিবারে নেই। বেশিরভাগ মানুষের চিন্তা-ভাবনাই উচ্চাভিলাসী। শিক্ষিত হয়ে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে বড় কোনো অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখি আমরা।চার্বাকপন্থীদের মতে ‘যাবৎ জীবেত সুখং জীবেত, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত’। অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচো সুখে বাঁচো। এ তো দেখি ভোগবাদিতার চুড়ান্ত। এক অবিমৃশ্যকারী বাসনা।আবার অন্য পন্থীরা বিশেষ করে সন্ন্যাস গ্রহণকারীরা বলেন, ‘ত্যাগেই মুক্তি, ভোগে নয়’। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত সন্ন্যাসীদের মধ্যে কিছুদিন কাটাতে গিয়ে সেখানে দুধ আর ঘিয়ের মোচ্ছব দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন। যতœআত্তিতে তারও ‘কিছুটা ভুঁড়ির লক্ষণ দেখা দিয়াছিল’।

আমাদের শিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্যও এমনটাই। বাবা,মায়েরা পরিবার থেকেই শিশুদের মনে এমন একটা স্বপ্নের বীজ বপন করে দিয়েছি। সন্তানদেরকে টাকা উপার্জনের মেশিন হিসেবে তৈরি করতে মরিয়া হয়ে ছুটছি কিন্তু তাদের মানবিক শিক্ষার দিকে নজর দিচ্ছি না।আপনি যদি ৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেন- তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও? উত্তরে হয়তো ৪৭ জনই বলবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সরকারি বড় অফিসার হতে চাই।দুঃখের বিষয় হয়তো একজনও বলবে না আমি শিক্ষিত হয়ে একজন ভালো মানুষ হতে চাই। একবার ভেবে দেখুন বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে সেবামূলক বিভিন্ন পেশায় জড়াচ্ছি ঠিকই, কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য সে পেশাকে আমরা টাকা উপার্জনের পথ হিসেবেই নিচ্ছি।পৌরনীতির ভাষায় পরিবারকে বলা হয় ‘মানবিক গুণাবলি অর্জনের প্রথম শিক্ষাগার।’ নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে পরিবারের ভূমিকাই প্রধান। কারণ পরিবারের মধ্যেই এসবের বীজ প্রোথিত । পারিবারিক বন্ধনই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারে। একজন শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার। যেখানে বাবা-মা, পরিবার-পরিজন,আত্মীয়-স্বজন প্রত্যেক সদস্যই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। শিশুদের নৈতিকভাবে বিকশিত করতে হলে পরিবারের সদস্যদের নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন হওয়া খুবই জরুরি।মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হচ্ছে শিক্ষা। এ শিক্ষাক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান সাফল্য চোখে পড়ার মতোই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনেও বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়েছে। শিক্ষা অবকাঠামোতেও বেশ উন্নতি সাধিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার কথা বলতে গেলে- ইউজিসির ওয়েবসাইট বলছে, বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৬, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৬ এবং আন্তর্জাতিক বিশ^বিদ্যালয় ৩টি। সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ আছে ৩০টি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৫। এ পরিসংখ্যান থেকে দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।বাবা-মায়ের পরই ছেলেমেয়েরা শিক্ষকদেরই তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জন হিসেবে বিবেচনা করে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটাতে হলে প্রথমে শিক্ষকদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক গুণাবলি ধারণ ও লালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটাতে হলে সকল স্তরের শিক্ষাক্রমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে সন্দেহ নেই; কিন্তু নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ তৈরি হচ্ছে না। ফলে নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানের হাতে পিতা-মাতা হত্যার মতো ঘটনাও হরহামেশাই ঘটছে। নৈতিক ও মানবিক বোধ বিবেচনা বর্জিত কোমলমতি শিশু, কিশোর ও যুবসমাজ জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ, খুন, ধর্ষণের মতো মারাত্মক নানা অপরাধমূলক কাজে। পেশাজীবী ও কর্মজীবী মানুষ নির্দ্বিধায় ঘুষ-দুর্নীতির মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের অনৈতিক কাজের ফল হিসেবে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিশ^বাসী বাংলাদেশকে চিনছে।

সুশিক্ষার অভাবে মানুষ হয়ে উঠেছে আত্মকেন্দ্রিক। তারা সর্বদাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। নিজের চিন্তায় এতটাই মগ্ন যে, জন্মদাতা পিতা-মাতার সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের থাকে না। মানুষের এ স্বার্থান্বেষী রূপ ক্রমেই নিজের আত্মীয়-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় উচ্চশিক্ষিত,উচ্চপদস্থ চাকরিজীবি সন্তানের বাবা,মায়েররও স্থান হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, এটা সত্যিই দুঃখজনক। নিজেকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম নিজের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে হবে। অন্তরচেতনাকে জাগ্রত করতে হবে। শুধু পুঁথিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়লেই হবে না। সুশিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।সুশিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা মানুষকে নৈতিক, মানবিক ও নীতিনিষ্ঠ মূল্যবোধ সম্পন্ন করে তোলে। মানুষকে মিথ্যা, অন্যায় ও অসৎ পথ পরিহার করতে শেখায়। মিথ্যা পরিহার করে সত্যের আবিষ্কারই প্রকৃত শিক্ষা। এজন্য যথার্থই বলা হয়, শিক্ষা ও নৈতিকতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, একটা ছাড়া আরেকটা অসম্পূর্ণ। নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলি বর্জিত শিক্ষা কুশিক্ষারই নামান্তর। আর এ কুশিক্ষা মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে দেয়।সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো সম্পদের সমবণ্টনসহ শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থার যে স্বপ্ন দেখেছিল, তাতে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি বা রাষ্ট্র কেউই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাদের ভোগবাদিতার আকাঙ্খা পুঁজিবাদী বিশে^র চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না বলে আজ সমাজতন্ত্রের নেকাবের নিচে পুঁজিতন্ত্রের ফল্গুধারা।সত্যিই কি যেনো হয়েছে এই পৃথিবীর। রোদ ঝলমলে,শিশির ভেজা,কর্দমাক্ত,বৃষ্টিমুখর, প্রাণবন্ত যে ভূবনে চলাফেরা করে আমরা আশ^স্ত হতাম, সেই বসুন্ধরাই আজ কেমন যেন মনমরা। পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে ও আগের মত আর তেজ নেই, প্রতিটি দিনই কেমন যেনো অমাবস্যা নিয়ে এসেছে আমাদের জীবনে।
এই যে এত লম্বা লকডাউন,শখের কেনাকাটা নেই, ঘোরাঘুরি নেই, খাওয়াদাওয়া নেই, তাতে ভোগবাদী মানুষের যে খুব ক্ষতি হয়েছে, তা তো নয়। কিন্তু মানসিক স্ফূর্তি কি আছে? ওই এক কথা ‘আর কত দিন? আর ভাল্লাগে না!’ মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আনন্দও দরকার। পুরুষেরা ঘরের মধ্যে থেকে দাড়িগোঁফ ছেড়ে দিয়ে বুড়ো হচ্ছেন, নারীরা সাজসজ্জা বিমুখ হয়ে বিষন্নতায় ভুগছেন, অল্প বয়সীরা বাইরে বেরোতে না পেরে বিরক্তির একশেষ।

দেশের বাইরে ভ্রমণে গেলে আমরা কি কেবল দর্শনীয় স্থান বা ঈপ্সিত বস্তুই দেখে থাকি ? কেনাকাটা করাও ভ্রমণেরই অংশ। কিন্তু যারা দেখার চেয়ে বেশি কেনাকাটাকে প্রাধান্য দেন, তাদের নির্দোষ ভোগবাদীর বেশি কিছু ভাবা যায় না।ঊষার সূর্য এর স্নিগ্ধ আমেজেও হৃদয় আজ উত্তপ্ত হয় না, মনে হয় যেনো শীতের ঐ তীক্ষè আঘাত হানা ছুরির মত রুদ্র বায়ু অবিরত আঘাত হানছে আমাদের রুক্ষ বুকে।চিরতরে যেনো বিদায় নিল আমাদের সুখ -স্বাচ্ছন্দ সমেত সমস্ত আবেগ। গোটা বিশে^র আকাশে যেনো নেমে এসেছে দুর্যোগ,যে দুর্যোগের অধিনায়কত্ব করছে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। তবুও মনমরা এই পৃথিবীর বুকে উত্তমেরা আজ এসেছে পাপ -পূণ্যের বিচার করতে। কোথায় ছিল তারা যখন পৃথিবী রোজদিন এগিয়ে যাচ্ছিল এই মহামারীর দিকে। দাঙ্গা হাঙ্গামা কেনো আজ চড়ে বসেছে ভীষণ করে, কেনো তারা শক্তিজোট গড়তে পারেনি। কয়েক দশক আগে যেমন করে তারা নেপোলিয়ন কে পরাস্ত করেছিল। কেনো আজ আমরা সেক্সপীয়র,রবি ঠাকুরের বাণী ভুলে গেছি।পৃথিবীটা শুধুমাত্র তাদের নয় যারা উত্তম,অধমেরাও রক্ত-মাংসের-ই সৃষ্ট। রুক্ষ,থমথমে এই বসুন্ধরায় ব্যর্থতা,পাপ -পুণ্যের বিচার করা বন্ধ করে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে।সুকুমার প্রবৃত্তির প্রশ্রয় দিতে গেলে একটু বেহিসেবি না হলে চলে না। ব্যয়কুণ্ঠা যেমন নিন্দনীয়, অবিমৃশ্যকারিতার ফলও তেমনই ভয়াবহ। সবচেয়ে ভালো, ‘লোভের রাশ টেনে ধরা।’ এই মহামারি থেকে আমাদের এ শিক্ষা হলে ভালো যে আমরা অনেক বাহুল্য বর্জন করেও চলতে পারি। আমরা অপচয়ের আনন্দে মেতে না উঠলে প্রকৃতির ওপর চাপ কম পড়ে। নির্মল আনন্দের জন্য একটি ফুলই যথেষ্ট।
একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, নিয়মানুবর্তিতা যেমন তার শারীরিক স্বাস্থ্যের ভালোমন্দের নিয়ামক, তেমনি জীবনযাপনে পরিমিতিবোধও পরিণামদর্শিতার পরিচায়ক। যেসব সন্তান অভিভাবকের কাছে কিছু চাওয়ার আগেই দ্বিগুণ পেয়ে অভ্যস্ত, তাদের ভবিষ্যৎ দুর্ভাবনামুক্ত নয়। কথায় আছে, ‘শখের তোলা আশি টাকা।’ অনেক প্রতীক্ষার পর যে শখ মেটে তার আনন্দ অপার্থিব। শখ, আনন্দ থাকবে, কিন্তু তা যেন লোক দেখানো প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়। কারণ, কথায় আছে, ‘অতিরিক্ত সবকিছুই বিষ’। অতি ভোগবাদিতার বিষের আক্রমণে আমরা এখন নাকমুখ ঢেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে আছি। চারদিকে মৃত্যুর মিছিল। দীর্ঘশ^াস ফেলছি আর বলছি, ‘জীবন এত ছোট কেনে?’
কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের ভাষায় বলতে ইচ্ছে হচ্ছে: ‘এহন তুমি কাঁদতিছ? তুমি এহন কাঁদতিছ?’
একদিন এ পৃথিবীকে নতুন রূপে, নতুন চিন্তা-চেতনায়, সত্যিকারের মনুষ্যত্বে ভরিয়ে তুলবে ওরাই। এ জন্য চাই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম। চাই ঘরে ঘরে মনুষ্যত্বের চর্চা। চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ।
আবার বাঁচবো আমরা,আবার জিতবো আমরা। শশীর আলো,রবির তেজ আবার প্রাণবন্ত করে তুলবে গোটা বিশ^কে, তবে এবার শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেধে বেধে থাকি’ বাণীকে সরিয়ে রেখে ‘একলা চলো’ বাণীকে আধুনিকতার সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে বিশে^র সকল প্রাণের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই আমরা আবার হাসতে পারব প্রাণ খুলে,মন খুলে,হৃদয় খুলে।

এম এ কবীর
সাংবাদিক,কলামিস্ট,
গবেষক,সমাজ চিন্তক


ট্যাগ :

আরো সংবাদ