বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

চরম সংকটের মুখে বাংলাদেশ-উত্তরণের জন্য যা করণীয়

প্রকাশের সময় : ১৮ এপ্রিল, ২০২০ ৫:৩১ : অপরাহ্ণ

বিশেষ সম্পাদকীয় : সমগ্র বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ তথা ধনী-গরীব-মধ্যবিত্ত সবাই মহা আতঙ্ক ও অস্বস্তির মধ্যে দিন যাপন করছে। আগামী দিনটি কেমন যাবে তা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারছেনা। এর মধ্যে এপ্রিলের ১০ তারিখ হতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা। চীন, ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি হতে পরবর্তী চল্লিশ দিনের তালিকার সাথে বাংলাদেশের তালিকা তুলনা করলে তাতে আমাদের আতংকিত হতে হয়। কেননা বাংলাদেশে খুব দ্রুত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এভাবে মৃত্যু বাড়তে থাকলে ও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেলে এদেশে যে কি ভয়ানক পরিস্থিতি হবে তা অকল্পনীয়। আমরা চরম বিপদের মুখোমুখি হয়ে আছি,এখনই যদি আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তাহলে এই বিপদ থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। বিটি নিউজ এর পক্ষ থেকে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করছি।

প্রথম হলো স্বাস্থ্য খাতে করোনা নির্ণয়ের জন্য  বেশি বেশি করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।  স্বাস্থ্য  খাতে কোনো প্রকার  দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। কিভাবে ব্যবহার অনুপযোগী ও মানহীন এন-৯৫ মাস্ক ও  পিপিই ডাক্তারদের সরবরাহ করা হয়েছে যা নিয়ে আজ ১৮ই এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রধান শিরোনাম করা হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত করে  দুর্নীতি নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ এখন মানুষের জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত এখানে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে যে একশ্রেণীর দানব শকুনী দৃষ্টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি করে ব্যবসা করার জন্য বসে আছে। তারা আশা করছে দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করুক, তারপর তারা বিভিন্ন জিনিস ক্রয় বিক্রয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করবে।এই চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। যথাসম্ভব দ্রুত বিভাগীয় জেলাগুলোতে পিসিআর মেশিন বসানোর ব্যবস্থা করা হোক যাতে অধিক সংখ্যক পরীক্ষা করা যায় । এছাড়াও গণস্বাস্থ্যের কীট কিভাবে দ্রুততম সময়ে বাজারে এনে সহজে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে । বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো মানসম্পন্ন পরীক্ষার কীট আমদানি করে সরকার নির্ধারিত একটি সহনীয় মূল্যে যাতে টেস্ট করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে । গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে লোকজন আইইডিসিআর এর উপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে একই ধরনের রোগাক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই তার চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। প্রত্যেকটি টিভি চ্যানেলে যদি দৈনিক দৈনিক ৫-৬ ঘন্টা করে টেলিমেডিসিনের  অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাহলে দেখা যাবে আইইডিসিআর এর উপর ফোনের উপর চাপ কম হবে এবং সাধারণ জনগণও টিভি দেখে সহজে স্বাস্থ্যবিধি জানতে পারবেন।  ডাক্তার নার্স এবং চিকিৎসা কর্মীরা যাতে সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও যারা সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবর্জনা পরিবহন করে তাদেরকে পিপিই প্রদানের মাধ্যমে নিরাপত্তা দিতে হবে। আমরা ঋণাত্মক ভাবেই যদি ধরে থাকি যে, আমাদের দেশে এটা যদি কোন চরম অবস্থা হয়, যদি অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয় প্রতিদিন সেই ক্ষেত্রে তাদের জানাজা ও দাফন কাফনের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যারা কাজ করবে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হবে । অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে । আমাদেরকে সকল নেগেটিভ দিক হিসাব করেই এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যবস্থা নিব ওটা করার সুযোগ নেই ।কারণ বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশগুলো এই করোনা রোগীদেরকে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, এটা দেখার পরেও যদি আজকে আমরা নিজেদেরকে সজাগ করতে না পারি, পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারি,তাহলে এর চেয়ে বড় দুঃখের বিষয় আর কিছুই থাকবে না । যখন ঢাকা শহরে শত শত লাশ পাওয়া যাবে তখন কেউ কাউকে সাহায্য করতে আসবে না । আজকে পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জনগণকে সেবা দিচ্ছে তা অতুলনীয়, এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ । কিন্তু তারাও তো মানুষ, তারাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে,সেই ক্ষেত্রে দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে এটা কি আমরা ভেবে দেখেছি ? তাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । ইতিমধ্যে দেখা গেছে, কালোজিরা ও মধু খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এক্ষেত্রে আইনশৃংখলাবাহিনী সদস্যদেরকে বিনামূল্যে এ দুইটি পথ্য দেওয়া যায় কিনা তা সুবিবেচনার যোগ্য। আল্লাহ আমাদের দেশের সবাই থেকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করুক এটা আমরা আন্তরিকভাবে চাই। কিন্তু তারপরও যে কোন মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে।

আর সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো করোনা আতঙ্ক মানুষের অন্তর থেকে দূর করা। যারা করোনা থেকে সুস্থ হয়েছে তাদেরকে গণমাধ্যমে এনে কথা বলানো যে ,তারা কিভাবে সুস্থ হয়েছে, এতে বাদবাকি লোকজনের মনে একটি আস্থা সৃষ্টি হবে । এখন সবাই মনে করে, করোনা আক্রান্ত হলে আমার মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি।যে আক্রান্ত হচ্ছে কেউ তার সাহায্যে যাচ্ছে না, তাকে সামাজিকভাবে ঘৃণার চোখে দেখা হচ্ছে, অপদস্থ করা হচ্ছে এই জিনিসগুলো থেকে আমাদেরকে মুক্ত হতে হবে । করোনার সাথে যুদ্ধ করে আমাদেরকে জয়ী হওয়ার জন্য এটা হল সবচেয়ে বড় বিষয় যে এটাকে সাধারন অসুস্থতা মনে করতে হবে। করোনা আতঙ্কে মানুষ অধিক অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষকে সেবা দিচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হলো, যারা হাসপাতলে আইসোলেশন থাকবেন তারা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে।শুধু হসপিটালে ভর্তি হলেই হবে না তাকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কিনা, চেকআপ করা হচ্ছে কিনা এই জিনিসগুলো দেখতে হবে । এমনিতেই আমাদের সবকিছু সংকট রয়েছে আর সাধারণ মানুষ যে কি নিদারুণ কষ্টে আছে সেটা বলার কিছু নেই। খাওয়ার কষ্ট সবচেয়ে বেশি চলছে গরিব মানুষদের।মধ্যবিত্তরাও মুখ বুজে সব কষ্ট সহ্য করছে।খাদ্য সংকট হ্রাসে আমাদের পক্ষ থেকে একটা প্রস্তাব করছি, এই প্রস্তাবটা হচ্ছে আমরা ‘পিপলস ফর পিপল’ সেবা চালু করা যায় কিনা অর্থাৎ যাদের  বাসায় পর্যাপ্ত খাবার রান্না হয় বা যাঁরা দান করতে চাই ইচ্ছুক কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বা লকডাউনের কারণে গরিব মানুষদের কে কোন কিছু দান করতে পারছে না, তাদের ঘর থেকে স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে খাবার এনে আমরা ঐ এলাকাভিত্তিক গরিব মানুষদের ভিতর বিলিয়ে দিলে সহজেই রাষ্ট্রের উপর চাপ কমে যায়।বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন যেভাবে করছে সেভাবে প্রত্যেক অভিজাত এলাকার স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা এগিয়ে আসলে এলাকাভিত্তিক দরিদ্র লোকেরা খাদ্য সংকটে আশা করি থাকবে না। আসলে মূল বিষয় হচ্ছে করোনার চাইতেও করোনার আতঙ্কে এবং আর্থিক সংকটের কারণেই মানুষ অনেক বেশি কষ্টে আছে । এক্ষেত্রে লকডাউন এর মেয়াদ আরো কিছুদিন বাড়াতে হবে এবং কঠোরভাবে পালন করতে হবে, এরপরে রোজার মাঝামাঝি বা ঈদের আগেই যদি লকডাউন না তোলা হয় তাহলে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এবং আপামর জনসাধারণ প্রচন্ড সংকটে পড়ে যাবে। দেশে এমনকি খাদ্য সংকট হতে পারে যা দেশে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে নিতে পারে।  আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কৃষকরা এখন পণ্যের মূল্য পাচ্ছেনা জমিতেই ফেলে আসছে তার ফলানো মূল্যবান ফসল। এরপর সে তার পুঁজি হারাচ্ছে, ভবিষ্যতে সে চাষবাস করার আর পুঁজি খুঁজে পাবেনা,  আগামীতে বর্ষাকাল সে ক্ষেত্রে আমাদের চাষাবাদযোগ্য জমি কমে যাবে । এছাড়া মানুষের ভিতরে যদি আতঙ্ক ঢুকে যায় এবং মানুষ খাদ্যশস্য মজুদ শুরু করে, সেই ক্ষেত্রে দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দুর্ভিক্ষ চলে আসবে।এই বিষয়টিকে মাথায় রেখে প্রণোদনা দিয়ে কৃষিকাজে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে যাতে দেশে খাদ্য সংকট সৃষ্টি না হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার এই দুঃসময়ে আপনি একক ভাবেই দিনরাত এই সংকট মোকাবেলার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। কঠোরভাবে লকডাউন পালনের মাধ্যমে রমজানের প্রথম দশকের মধ্যেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে করোনামুক্ত করার জন্য গণমাধ্যমকে স্ব-উদ্যেগী ভূমিকা পালন করতে হবে।দেশের তরুণ অনেক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার্থীরা স্বল্প খরচে ভেন্টিলেটরসহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি তৈরি করেছে মর্মে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাদের আবিস্কারগুলো কাজে লাগানো যায় কিনা এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।রমজান শুরু হওয়ার পূর্বেই দেশের সকল দরিদ্র জনগণের ঘরে যেকোন মূল্যে খাবার পৌঁছিয়ে কঠোর লকডাউনের ব্যবস্থা না নিলে দেশ এক মহাসংকটে পতিত হবে, যা থেকে আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন হবে।মহান দয়াময় আল্লাহ এই মহাদূর্যোগে আমাদের দেশ ও জাতিকে রক্ষা করুন এটাই একমাত্র প্রত্যাশা।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ