রোববার, ৯ আগস্ট ২০২০ ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

লজ্জাবতীর সমূদ্রস্নান

প্রকাশের সময় : ২৯ জুলাই, ২০২০ ২:৪৪ : পূর্বাহ্ণ

আবদুল কাইয়ুম মাসুদ:এতো ঝিনুক দেখে রিমি দিশেহারা। রংবেরঙের ঝিনুক। দৃষ্টিনন্দন নানা ডিজাইনের ঝিনুক! দেখে দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তার। বালির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এসব ঝিনুক। বালি সরে যাওয়ায় আজ দৃশ্যমান হয়েছে। রিমির সুযোগ হলো, প্রথম বারের মতো ঝিনুক কুড়াবার। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রিমির কাছে নতুন নয়। আগেও এসেছে। বেশ কয়েকবার। মা বাবার সাথে অথবা স্কুল কলেজের পিকনিকে।
কখনো এতো ঝিনুক চোখে পড়েনি রিমির। আজ দেখছে। সামনের দিকে যাচ্ছে আর নানা রকমের ঝিনুক দেখছে সে। বিচিত্র এ অভিজ্ঞতা তার মন ভরিয়ে দিচ্ছে। ঝিনুক খুঁজতে খুঁজতে সে অনেক দূর চলে গেছে। ভিন্ন ভিন্ন রূপের ঝিনুক পাওয়ার নেশায় বিভোর সে। পেছন ফিরে দেখে তার জীবনসঙ্গী দাঁড়িয়ে আছে। একা। স্থির দৃষ্টি তার দিকে। হয়তো উপভোগ করছে রিমির ঝিনুক কুড়ানোর দৃশ্য।
জনমানবহীন বিচ-এ কিছুটা শংকাও কাজ করছে। রিমি আরও এগিয়ে যাচ্ছে। তার হাসবেন্ড যতক্ষণ আছে ততক্ষণ কোন ভয়কে জয় করা যাবে। এ আত্মবিশ্বাস তার আছে।
বৃষ্টি থামছেই না। ঝুম ঝুম বৃষ্টি। রাসিদ সৈকতের ছাতা সম্বলিত চেয়ার বা ‘কিটকট’র দুটো ছাতা একসাথে দিতে বলেছে ছেলেটিকে। বৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা। তাদের দু’জনকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা কিটকট এর দায়িত্বে থাকা এ ছেলেটিরও ছিলো। অন্তত একটা সিট ভাড়া নিশ্চিত হবে। তাই সে দুই/তিনটা ছাতা এনে চেষ্টা করেছে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে। সে সফল হতে পারেনি।
এরমাঝে যে কয়জন ঊষাকালিন পর্যটক এসেছেন একে একে তারা সবাই চলে গেছেন। রাসিদ আর রিমি রয়ে গেছে। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে কিটকট রেখে সে ছেলেটিও বীচ সংলগ্ন দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বিশাল সমুদ্রের ধারে এখন শুধু দুটো মানুষ। রাসিদ আর রিমি। তাও একজন থেকে আরেক জনের থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে। তবুও তাদের ভালো লাগছে।
রাসিদ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল আকাশ থেকে বারিধারা ঝরছে; জলে ও স্থলে। ভূমিতে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য সে অনেক দেখেছে। সমূদ্রে এটিই প্রথম। বৃষ্টি আর সমুদ্রের পানির খেলা ভীষণ ভালো লাগছে তার। মনে হচ্ছে প্রতিনিয়ত অসংখ্য তীর সমূদ্রের বুক ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা করছে। সমূদ্রও বুক পেতে দিয়েছে। রাসিদের গায়েও পানি বোমা লাগছে। বৃষ্টির ফোটা পানির তৈরি তা মাটির দেহ সয়ে যাচ্ছে নীরবে। তারওপর জামাকাপড়ও সহায়ক হয়েছে। অবিরত বৃষ্টির ফোটা সয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে।
রাসিদ বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে তাকিয়ে আছে। যতদূর দেখছে সব ঘোলাটে পানি। বালির ওপর বড় বড় সাইজের বৃষ্টির ফোটা পড়ছে, মাটি ধুয়ে বালিসহ সমুদ্রে গড়িয়ে পড়ছে। বালির নিচে লুকিয়ে থাকা সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক বেরিয়ে আসছে। আর সমুদ্রের পানি ঘোলা হচ্ছে।
আজ তেমন বাতাসও নেই। ঢেউও তার ছন্দ হারিয়েছে। সমুদ্র আজ ক্ষতবিক্ষত। বৃষ্টির ফোটা প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছে; সমূদ্রের বুকে। স্থির, নিস্তেজ ভিন্নরূপের এক সমুদ্র দেখছে সে। বৃষ্টির ফোটাগুলো নিরবে ধারণ করে যাচ্ছে, বিনিময়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে তার জলরাশি।
রিমি আজ ভোরে ফজরের আজান শোনার সাথে সাথে ঘুম থেকে ওঠে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন সেরে রাসিদসহ হোটেল থেকে বীচে এসেছে। সে বেশ লাজুক। সকালে পর্যটকদের ভীড় এড়িয়ে গোসল সারবে আজ লজ্জাবতী। দীর্ঘ সময় নিয়ে। রাসিদের হাত ধরে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বিশাল বিশাল ঢেউয়ের দোলায় রোমাঞ্চিত হবে।
গতকাল ভোরেও তারা এসেছিলো। সমূদ্রের পানিতে নেমে গোসল করেছে। ঘুম থেকে ওঠে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছিলো, তাই বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। ভীড় বাড়ার সাথে সাথে রিমির চেহারার লালিমাও বাড়তে থাকে। ঊষা ফেটে সদ্যোদিত সুর্যের কচি আলোর স্বর্ণালি আভা সে চেহারার ওপর যখন পড়েছে তখন কি যে অপরূপ শোভার অবতারণা হয়েছে সেটি রাসিদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। অমূল্য স্মৃতিসম্পদ হয়ে।
ঢেউ আঁচড়ে পড়ার সময় প্রথম প্রথম খুব ভয় হতো রিমির। রাসিদের হাত আটকে ধরে থাকতো সে। আস্তে আস্তে ঢেউয়ের সাথে দোল খাওয়া শিখে গেছে। দু’জনে একসাথে দোল খেয়েছে; কখনো কখনো একাকার হয়ে। মাঝে মাঝে রিমি রাসিদের চেহারার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছে। সুর্যের কোমল আলো রাসিদের অপরিনত দাড়ির ফাঁক গলিয়ে ফর্সা চেহারায় পৌঁছানোর পর সে সূর্যরশ্মি যে কি যে দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিলো চারিদিকে রিমি তা দেখে ক্ষণিক স্তম্ভিত হয়ে অপলক নেত্রে হারিয়ে গেছে; বহুবার। পরক্ষণে বড় আকারের ঢেউ এসে পড়লে তার হাত আটকে ধরে থাকা রাসিদের হাতের তৎপরতায় সম্ভিত ফিরে পেয়েছে। মেতে ওঠেছে স্রোতের সাথে দোল খেলায়।
মাঝে মাঝে উঁচু ঢেউ চুবিয়ে দিয়ে গেছে। ফোটা ফোটা পানি রাসিদের দাঁড়ি বেয়ে বেয়ে পড়েছে। প্রতিটি ফোটা সূর্যালোকের ঝলকানিতে মুক্তোর রূপ ধারণ করেছে। সব মিলিয়ে যার হাত ধরে মধুচন্দ্রিমায় এসেছে তার সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করেছে, বারংবার। আহা! এমন সুন্দর পুরুষও হয় বুঝি!
গতদিনের এমন সুখস্মৃতির তাড়া থেকেই আজ সুর্যোদয়ের আগেই তারা বীচে এসেছে। আসার পর পরই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। সেই রকম বৃষ্টি। পানির ফোটা বলতে আমরা যে সামান্য পানির দলা বুঝি এগুলো সেরকম ফোটা নয়। স্বাভাবিক বৃষ্টির ফোটার চেয়ে অনেক বড়। জামাকাপড় ভেদ করে শরীরেও আঘাত করছে। তারপরও রিমি অপেক্ষা করেছে। বেশ কিছুক্ষণ ভেজার পর দু’জনই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অপরাপর পর্যটকদের মতো তারাও বীচ থেকে ফিরে গেছে। পরম যত্নে নিয়ে গেছে কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুকগুলো।
আজ তাদের গোসল হয়েছে বৃষ্টির পানি দিয়ে। নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন পানি। সৈকতেই গোসল হয়ে গেছে রিমির। তটে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ-গাছালির মতো। বৃষ্টির ফোটা পড়ছে আর এসব গাছের পত্র পল্লব শিহিরিত হচ্ছে। সারি সারি গাছ-গাছালি ধুলোময়লা মূক্ত হয়ে সতেজ, সজিব হয়ে উঠছে।
আজ রিমির সমুদ্রের পানিতে নামা হয়নি, ছন্দময় ঢেউয়ের তালে তালে দোল খাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঊষার গগনে আলো দেখেনি। সূর্যালোকের দেখাও মেলেনি।

আবদুল কাইয়ুম মাসুদ
প্রভাষক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
কর্ণফুলী এ জে চৌধুরী কলেজ, চট্টগ্রাম


ট্যাগ :

আরো সংবাদ