শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ ২০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

গাছ লাগাই, অক্সিজেনের প্রাকৃতিক উৎস সমৃদ্ধ করি

প্রকাশের সময় : ২৯ জুন, ২০২০ ২:১৮ : পূর্বাহ্ণ

আবদুল কাইয়ুম মাসুদ:অক্সিজেন গ্যাসের নাম এ কয়দিনে একটু বেশিই শুনেছি। এই গ্যাস কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা আগে কিছু সংখ্যক লোকে জানতো এখন বিশ্বের প্রায় সবাই জানে। করোনা ভাইরাস তা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি করোনায় শ্বাসকষ্ট হয়। আর এ সময়ে বাহির থেকে অক্সিজেন দেয়ার প্রয়োজন হয়; ঔষধের মতো। এতে রোগী আরাম বোধ করে এবং বেঁচে থাকতে সহায়ক হয়।তাই জীবন বাঁচাতে অনেক মানুষ বা সংগঠন অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে সংরক্ষণ করে রেখেছে; নিজ বাসায় বা অফিসে।
বিবিসি বাংলা বিগত ৫ জুন,২০২০ ইংরেজি, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অক্সিজেন প্রস্তুতকারী আন্তর্জাতিক কোম্পানি লিন্ডে-র বিক্রয় কেন্দ্রে খবর নিয়ে জেনেছে যে, অক্সিজেনের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে সরবরাহ কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তারা।এখন জেনে নিই অক্সিজেন সিলিন্ডার কি?
অক্সিজেন রাখার জন্য ধাতব লোহার তৈরি একটি বিশেষ পাত্র, যার ভেতরে উচ্চচাপে এ গ্যাস রাখা হয়। উচ্চচাপের ফলে অনেক পরিমাণ অক্সিজেন এ পাত্র ধারণ করে রাখতে সক্ষম হয়। মিনিটে এক লিটার অক্সিজেন দিলে মাঝারি ধরনের সিলিন্ডারে রোগী আনুমানিক ২২ ঘণ্টা অক্সিজেন পায়। কোভিড১৯ রোগীর ক্ষেত্রে মিনিটে ৪০/৫০/৬০ লিটার পরিমাপে অক্সিজেন দেয়ার কথাও শুনেছি। এ পরিমাপ রোগীর কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করে। ডাক্তারগণই তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
রক্ত পরীক্ষা করে যদি ফলাফলে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ যা থাকা উচিত তার চেয়ে কম আছে তখন ঔষধের মতো নির্ধারিত মাত্রায় অক্সিজেন ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। সাধারণত নাকে নল দিয়ে অক্সিজেন দেয়া হয়।
সিলিন্ডারের পাশাপাশি বাজারে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরও পাওয়া রয়েছে। এগুলোও রোগীকে অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।কিভাবে কাজ করে এটি?
অক্সিজেন কনসেনট্রেটর এমন একটি মেশিন যা চালানোর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। এ মেশিন বাতাস থেকে সংগ্রহ করে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে রোগীকে প্রদান করে। যার সাহায্যে সাধারণত রোগীকে মিনিটে ৫ লিটার অক্সিজেন দেয়া যায়।
করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ে এ তথ্যগুলো কম বেশি আমরা সবাই জেনেছি। কেউ কেউ ভাবতে পারেন যে, বৈশ্বিক মহামারীর এ সময়ে ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অক্সিজেন। কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তবে কি স্বাভাবিক বা সুস্থ অবস্থায় মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন হয় না?
উত্তর যদি এককথায় বলি তাহলে হবে অবশ্যই প্রয়োজন। শুধু মানবদেহ না পুরো জীব জগতের জন্য এ গ্যাস অপরিহার্য। মানুষ শ্বাস নেওয়ার সময় শরীরের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বায়ুমন্ডল থেকে গ্রহণ করে ও শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক কার্বন ডাই অক্সাইড পরিত্যাগ করে। অক্সিজেন অন্যান্য গ্যাসের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে; বায়ুমন্ডলে।আয়তনের হিসেবে বাতাসে ৭৮.০৯% নাইট্রোজেন, ২০.৯৫% অক্সিজেন, ০.৯৩% আর্গন, ০.৩৯% কার্বন ডাই অক্সাইড এবং স্বল্প পরিমান অন্য গ্যাস থাকে। এ ছাড়াও বাতাসে বিভিন্ন মাত্রার জলীয় বাস্প থাকে। যেমন, গড়ে সমুদ্রতলে ১% ও সামগ্রিক বায়ুমণ্ডলে ০.৪%। তাহলে শরীর কিভাবে গ্যাসের মিশ্রণ থেকে অতীব প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পেয়ে থাকে তা জানবার আগে জেনে নিই, বায়ুমন্ডল এ সকল গ্যাসের ভারসাম্য কিভাবে রক্ষা করা হয়?
বন বা উদ্ভিদ এর গ্যাস আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। গাছ-গাছালি অক্সিজেন ত্যাগ করে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহন করে। এ যেনো মানুষের সাথে গ্যাসের বিণিময়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশের মোট বনভূমির আয়তন হচ্ছে- ১৭.৪ ভাগ। এদেশের ভারি জনসংখ্যার তুলনায় বনভূমি খুবই কম। দিন দিন তাও কমে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু কিছু বন কেটে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আসবাবপত্র ও জ্বালানী কাঠের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে অথবা বসতি স্থাপন বা সৌন্দর্য বর্ধনের নামে ধ্বংস করা হচ্ছে মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু গাছ বা বনভূমি। নগরায়ন ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলেও ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি। বিলুপ্ত হচ্ছে জীবজন্ত ও বন্যপ্রাণী। এতে হুমকির মুখে পড়ছে দেশ ও দেশের মানুষ। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবী থেকেও বনভূমি দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিত্রাণের উপায়ও নিশ্চয় আছে, সেটা কি?
বনায়ন বা গাছ লাগানোর মাধ্যমে আমরা গাছের পরিমান বৃদ্ধি করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারি। এখন গাছ লাগানোর মৌসুম। প্রত্যেকেই পতিত জায়গা, আঙ্গিনা, ক্যাম্পাস ইত্যাদি যার যেখানে লাগানোর সুযোগ আছে সেখানে লাগাই। গাছ যে শুধু অক্সিজেন সাপ্লাই দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে বা আমাদের অতীব প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দিয়ে জীবন রক্ষা করে তা কিন্তু নয়, পুষ্টি চাহিদা মেটায়; ফল-মূল, তরি-তরকারি, শাক-সব্জি ইত্যাদি সব কিছুর উৎসও বটে। তাছাড়া কাঠের চাহিদাও পূরণ করে। এখন লকডাউনের কারণে সবার অপূরন্ত সময় আছে, একাজ খুব সহজেই করা সম্ভব। সময়টাও উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হলো।
এখন মানব দেহ বায়ুমন্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আসা যাক, আমরা যখন শ্বাস নিই তখন আমাদের ফুসফুস প্রসারিত হয় এবং আমাদের মুখ ও নাক দিয়ে শরীরের ভেতরে বাতাস ঢুকে পড়ে। এ সময় শুধু অক্সিজেন নয় নাইট্রোজেন ও অন্যান্য গ্যাস মিশ্রিত বায়ু এতে বিদ্যমান থাকে। নাক ও মুখের মাধ্যমে নেয়া বাতাস আমাদের শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ব্রঙ্কিয়াল টিউবের মধ্য দিয়ে সে বাতাস শেষ অব্দি অ্যালভিওলাই (বায়ু থলি)-তে পৌঁছে।
এখানেই আলাদা করে অক্সিজেন গ্রহণের মূল কাজটি সম্পন্ন হয়। অ্যালভিওলাই-এর সরু দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে শুধুমাত্র বাতাসের অক্সিজেনের সংশ্লিষ্ট ক্যাপিলারি (রক্তবাহ)-তে প্রবেশাধীকার রয়েছে। রক্তের লোহিত কণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন বায়ু থলি থেকে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে।আর একটা কথা জেনে রাখা ভালো, খুবই সামান্য পরিমান নাইট্রোজেনও কিন্তু রক্তে মিশ্রিত হয়। এই নাইট্রোজেন নিস্ক্রিয় অবস্থায় থাকে এবং শরীরের কোনও ক্ষতি করে না। পরে অবশ্য তা প্রশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। আঙুল বা ঘাড় মটকানোর সময় যে শব্দ শুনা যায় তা আসলে সন্ধিস্থল থেকে বেরিয়ে আসা নাইট্রোজেনের কারণেই ঘটে।

 


ট্যাগ :

আরো সংবাদ