শনিবার, ৩০ মে ২০২০ ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

বৈশ্বিক মহামারীর এই সময়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি হউক দুঃস্থ অসহায়দের সাথে :লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য

প্রকাশের সময় : ২২ মে, ২০২০ ৭:২৩ : অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট: ইসলাম ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা অন্যতম। ঈদ শব্দের অর্থ ঘুরে ঘুরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। প্রচলিত অর্থে ঈদ মানে আনন্দ বা খুশি। দীর্ঘ একমাস রোজা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্য পালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। সর্বাধিক মহিমান্বিত ও সওয়াবে ভর্তি মাস পবিত্র রমজানের পরেই চন্দ্রবর্ষের দশম মাসের সূচনার মধ্য দিয়েই মাহে শাওয়ালের আগমন। আরবি যেহেতু চান্দ্র মাস তাই চাঁদ দেখার ওপরেই ঈদের আগমনী বার্তা নির্ভর করে। তাইতো নতুন চাঁদ দেখা মাত্রই রেডিও টেলিভিশন এবং পাড়া মহল্লার মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয় ঈদ মোবারক। সেই সাথে চারদিকে শোনা যায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পবিত্র ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে বিখ্যাত জনপ্রিয় ঈদের গান:
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।”
এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর সারাবিশ্বের মুসলমানদের রোজা ভাঙ্গার খুশির উৎসব। এ এক অনাবিল উৎসব, সীমাহীন আনন্দ। বছরজুড়ে নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-কষ্ট, বেদনা সব ভুলে ঈদের দিনে মুসলমান মাত্রই পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়। পেছনের সব গ্লানি বিস্মৃত হয়। সাধ্যমতো নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরে পূত-পবিত্রতার সৌকর্যে ঈদগাহের পথে নামে ধর্মপ্রাণ মানুষ। ঈদের দিন সকাল থেকে রাত অবধি অপার আনন্দে ডুবে থাকে সবাই। ঈদ ধনী-গরিবের নির্মল আনন্দ ও পুণ্যের এক দুর্লভ অনুভূতি যা ভাগাভাগি করলে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ঈদ মানবসমাজের ধনী-গরিব ব্যবধান ভুলিয়ে দেয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। ঈদের দুই রাকাত নামাজ হলো বার্ষিক নামাজ। মসজিদে, ময়দানে ঈদের নামাজে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলিমের সমাগম হয়ে থাকে। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ পড়েন। ঈদের দিনে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় ও একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করে সাম্যের জয়ধ্বনি করেন। রোজার পুণ্যময় মাস যেন একটি স্বচ্ছ সলিল সরোবর, যার জলের নির্মলতায় মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভেদের সব কালিমা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। মুসলমানগণ পুণ্যস্নাত ঈদের মধ্য দিয়ে সমর্পিত হয়, সেই নির্মলতার সীমানায় উত্তীর্ণ হয়। কামাচার, পানাহার, পাপাচার, মিথ্যাচার থেকে বিরত থেকে মাহে রমজানে সম্পূর্ণ দিবাভাগে অর্থাৎ সুবেহ সাদিকের পূর্বক্ষণ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজাদার আতœশুদ্ধির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন, যা তার জীবন-চেতনায় বয়ে আনে পরিশীলিত অনুভূতি। পুরো এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সারাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয়। রমজান মাসে সংযম ও আতœশুদ্ধি অনুশীলনের পর ঈদ-উল-ফিতর ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে, গড়ে তোলে সবার মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের মেলবন্ধন। ঈদের নামাজ শেষে ধনী-নির্ধন, পরিচিত-অপরিচিত সকলে সানন্দে কোলাকুলি করেন। ঈদ উৎসবের সন্ধিক্ষণে কে কত দামী পোশাক পরল, কে কত উত্তম পানাহার করল সেটা কখনও বিচার্য নয়; বরং বিচার্য বিষয় হচ্ছে নিজ আত্মাকে কে কতটুকু নিষ্পাপ রাখতে পেরেছে। এক মাস সংযম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির যে নিরলস প্রচেষ্টা বিশ্বাসীগণ চালান, ঈদ-উল-ফিতর এরই পূর্ণতার সুসংবাদ। নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এখন এই করোনা ভাইরাস মহামারীর মোকাবেলায় ব্যস্ত। সারাবিশ্বে তৈরি হয়েছে এক ভয়ানক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। আমাদের বাংলাদেশের এই মহামারীর থাবা এসে পড়েছে। দিন দিন আক্রান্ত আর মৃত্যুর হার যেন পাল্টা দিয়ে বাড়ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ মানুষ ঘরবন্দী রয়েছে। মূলত কিছু কাজ ছাড়া বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষ বেকার জীবনযাপন করছে। জীবন জীবিককার তাগিদে ছুটে চলছে প্রাণপণ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে যা ত্রাণ জুটছে তাতে পুরোপুরি কষ্ট লাঘব হচ্ছে না। তার পরেও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ পরিবার পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর প্রতিটি ঈদ সকলের মাঝে আনন্দ বিতরণের ঐশী বাণীরূপে মুসলমানের জীবনে ফিরে আসে। বস্তুগত জাগতিক প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদের মোহ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে মানুষের আড়ম্বরকে বিকশিত নির্মল উজ্জ্বল ও সুন্দর করে তোলাই সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য আর ঈদ-উৎসবের মাহাতœ্য। ঈদ মানুষের মধ্যে ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করে। ভেদাভেদহীন সমাজ তৈরির বিষয়টি পবিত্র ঈদ উৎসবের মধ্যে নিহিত রয়েছে। ইসলামের মর্মবাণী সামাজিক ঐক্য, সাম্য, মৈত্রী, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা প্রকাশ ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত সম্পর্কে সুগভীর উপলব্ধি। ঈদ উৎসব পালন একটি নিছক আনন্দ-বিনোদনের পর্ব নয়, এর মধ্যে নিহিত আছে সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য পালন ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য উদযাপনের তাগিদ। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার যথার্থ মর্যাদায় ঈদের আনন্দ প্রকৃত রূপ লাভ করে, সাদাকাতুল ফিতর ও জাকাত আদায়ের মাধ্যমে নিজের আনন্দ পরের তরে বিলিয়ে দেয়ার আসমানি তাগিদ পালনের সুবর্ণ সুযোগ মিলে। মানবজীবনের সুখ-দুঃখ-সঙ্কট ও আনন্দ-বেদনার ভেতর দিয়ে ঈদ-উল-ফিতর মুসলমানদের জন্য ভালবাসা ও কলুষমুক্ত নতুন জীবনের উপলব্ধি নিয়ে আসে। ধনী-দরিদ্র, আমির-ফকির, সাদা-কালো, উঁচু-নীচু সব শ্রেণির মানুষ মিলে একই আনন্দ-অনুভবে, একই খুশির জোয়ারে মহা ঐক্যের মিলন মোহনায় এসে সম্মিলিত হওয়ার এক অনন্য ব্যবস্থা এই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। কিন্তু এবারের ঈদের আনন্দ অনেকটাই মলিন। কেননা সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নাই উৎসব করার। যেহেতু এই বারের ঈদ আয়োজন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাই সমাজের উঁচু স্তরের মানুষগণ যদি গরীব দুঃখী নি¤œবিত্তদের মাঝে ঈদ উৎসব পালনের জন্য নিজেদের থেকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন তাহলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্যের বাণী। হাসি ফুটবে অসহায় মানুষের মুখে। ভাগাভাগি হবে ঈদের আনন্দ। এবারের কঠিনতম সময়ে ঈদ উদ্যাপন, তাই মন খারাপের কিছু নেই। জীবনের সব দুঃখ-যাতনা ও বৈষম্য-বঞ্চনা ঘোচাতে পারে না এক ঈদ; কিন্তু সবকিছুর ভেতর দিয়েও একটুখানি আনন্দ, একটুখানি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির নজির সৃষ্টি করতে পারে। সারাবিশ্ব সর্বপ্রকার লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত হোক! দেশে-বিদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিভীষিকা দূরীভূত হোক! পৃথিবীতে মানবতার ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব, শান্তি-সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন দৃঢ়তর হোক! সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ঈদ মোবারক।

 

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মরমী গবেষক।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ