রোববার, ৯ আগস্ট ২০২০ ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল

প্রকাশের সময় : ২৩ জুলাই, ২০২০ ৩:১১ : পূর্বাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট: জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। মর্যাদা বোঝাতে মহান আল্লাহ এ দিনগুলোর কসম খেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শপথ প্রভাতের। শপথ দশ রাতের।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ১-২)

এখানে যে ১০ রাতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো জিলহজের প্রথম ১০ রাত। (তাফসিরে ইবনে কাসির, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৫)

চারটি পবিত্র ও সম্মানিত মাসের মধ্যে জিলহজ অন্যতম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস ১২টি—আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। এর মধ্যে চার মাস সম্মানিত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদিস শরিফে এসেছে, ওই মাসগুলো হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব।

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের নেক আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল উত্তম নয়। সাহাবারা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও এই ১০ দিনের আমলের চেয়ে উত্তম নয়? রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও এর চেয়ে উত্তম নয়; তবে ওই ব্যক্তি ছাড়া, যে তার সর্বস্ব নিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করল এবং কিছুই নিয়ে ফিরে এলো না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৩৮, বুখারি, হাদিস : ৯৬৯)

যে কারণে এই দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন

১. আল্লাহ তা‌‘আলা এর কসম করেছেন : আল্লাহ তা‌‘আলা যখন কোনো কিছুর কসম করেন তা কেবল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদাই প্রমাণ করে। কারণ, মহা সত্তা শুধু মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরই কসম করেন। আল্লাহ তা‌‘আলা বলেন,
‘কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের।’ {সূরা আল-ফাজর, আয়াত : ১-২} আয়াতে ‘কসম দশ রাতের’ বলে যিলহজের দশকের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটিই সকল মুফাসসিরের মত। ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
এ মতটিই সঠিক।
২. এসবই সেই দিন আল্লাহ যাতে তাঁর জিকিরের প্রবর্তন করেছেন : আল্লাহ তা‌‘আ বলেন, ‘যেন তারা নিজদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিজিক দিয়েছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ {সূরা আল-হজ, আয়াত : ২৮} জমহূর উলামার মতে, আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলে যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটিই ইবন উমর ও ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমার মত।

৩. রাসূলুল্লাহ দিনগুলোকে শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন : যিলহজের এই দিনগুলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন জাবির রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

‘পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলো হলো দশকের দিনসমূহ। অর্থাৎ যিলহজের (প্রথম) দশদিন। জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এর চেয়ে উত্তম দিন নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদেও এর চেয়ে উত্তম দিন নেই। হ্যা, কেবল সে-ই যে (জিহাদে) তার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।’ [মুসনাদ বাযযার : ১১২৮; মুসনাদ আবী ই‘আলা : ২০৯০]
৪. এই দিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাফার দিন : আরাফার দিন হলো বড় হজের দিন। এটি ক্ষমা ও মাগফিরাতের দিন। জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নাজাতের দিন। যিলহজের এই দশকে যদি ফযীলতের আর কিছু না থাকত তবে এ দিবসটিই তার মর্যাদার জন্য যথেষ্ট হত। এ দিনের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘আরাফা দিবসই হজ’। [তিরমিযী : ৮৯৩; নাসায়ী : ৩০১৬]
৫. এতে রয়েছে কুরবানীর দিন : কোনো কোনো আলিমের মতে কুরবানীর দিনটি বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো কুরবানীর দিন অতপর স্থিরতার দিন’। (অর্থাৎ কুরবানীর পরবর্তী দিন। কারণ, যেদিন মানুষ কুরবানী ইত্যাদির দায়িত্ব পালন শেষ করে সুস্থির হয়।) [নাসায়ী : ১০৫১২; ইবন খুযাইমা, সহীহ : ২৮৬৬]
৬. এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতগুলোর সমাবেশ ঘটে :

জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমল

সিয়াম : রোজা রাখা অন্যতম একটি নেক কাজ। তাই এ দিনগুলোতে নফল রোজা রাখা খুবই পুণ্যময়। হুনাইদা বিন খালেদ তাঁর স্ত্রী থেকে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জনৈক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, আশুরার দিন ও প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা পালন করতেন।’ (আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ি)

আরাফার দিন রোজা : আরাফার দিন রোজা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, আরাফার দিনের রোজা আগের ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম)। তবে আরাফায় অবস্থানকারী হাজিদের জন্য রোজা রাখা মুস্তাহাব নয়। কেননা মহানবী (সা.) আরাফায় অবস্থান করেছিলেন রোজাবিহীন অবস্থায়।

হজ ও ওমরাহ সম্পাদন করা : হজ ও ওমরাহ এ দুটি হলো এ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক ওমরাহ থেকে আরেক ওমরাহ মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারাস্বরূপ আর কবুল হজের প্রতিদান কেবলই জান্নাত।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩; মুসলিম, হাদিস : ৩৩৫৫)

তাকবির ও তাসবিহ পড়া : এই দিনগুলোতে তাকবির (আল্লাহু আকবার), তাহমিদ (আলহামদু লিল্লাহ), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাসবিহ (সুবহানল্লাহ) পড়া সুন্নত। এ দিনগুলোয় জিকির-আজকারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এ ১০ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পাঠ করো।’ (বায়হাবি, শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৪৭৪)

জিলহজের চাঁদ উঠার পর করণীয় : জিলহজ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে নিয়ে চুল, মোচ, নখ, বগল ও অন্য স্থানের লোম বা পশম না কাটা মুস্তাহাব। এ সম্পর্কে উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জিলহজের চাঁদ দেখে এবং কোরবানির ইচ্ছা করে, সে যতক্ষণ কোরবানি না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন চুল বা নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৬৫৬)। তবে এ আমল মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।

তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা : জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজ থেকে নিয়ে ১৩ তারিখের আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব।

নারী-পুরুষ সবার জন্য ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা কর্তব্য। (ফাতাওয়ায়ে শামি)

এ তাকবির একবার পাঠ করবে। তাকবিরে তাশরিক হলো, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

পশু কোরবানি করা : এ দিনগুলোর দশম দিন সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব।

 

অন্য সাধারণ আমল বেশি বেশি করা :
উপরে যে নেক আমলগুলোর কথা উল্লেখ করা হলো এসব ছাড়াও কিছু নেক আমল আছে যেগুলো দিনগুলোতে বেশি করা যায়ঃ
যেমন : কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দু‘আ, দান-সাদাকা,
পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচার, আত্মীয়তার হক আদায় করা, মা-বাবার সখী-সখার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো,
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, সালামের প্রচার ঘটানো,
মানুষকে খাবার খাওয়ানো, প্রতিবেশিদের প্রতি সদয় আচরণ করা, মেহমানকে সম্মান করা,
পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া,
অপর ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করা, অসাক্ষাতে অন্য ভাইয়ের জন্য দু‘আ করা,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া, পরিবার ও সন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয় করা,

আরও যেসকল আমল করতে পারেন সেগুলো হল;
অধিনস্তদের প্রতি সদয় হওয়া,
ওয়াদা ও আমানত রক্ষা করা, হারাম জিনিস থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া,
সালাতগুলোর পরে আল্লাহর জিকির করা, সুন্দরভাবে অযূ করা, আযান ও ইকামতের মাঝখানে দু‘আ করা,
জুমাবারে সূরাতুল কাহফ পড়া, মসজিদে গমন করা, সুন্নত সালাতগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আদায় করা,
ঈদগাহে গিয়ে ঈদুল আযহার সালাত আদায় করা, হালাল উপার্জন করা,
মুসলিম ভাইদের আনন্দ দেওয়া, দুর্বলদের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া, কৃপণতা পরিহার করা,
ভালো কাজে পথ দেখানো, ছেলে-মেয়েদের ‌সুশিক্ষা দেওয়া, কল্যাণকাজে মানুষকে সহযোগিতা করা ইত্যাদি।

এসবের প্রতিটিই ঈমান ও আল্লাহর মুহাব্বত বৃদ্ধি করে ফলে আল্লাহও তাকে বেশি ভালোবাসেন। এসবই একজন মুমিনের চরিত্র মাধুরীর অংশ। এসবের মাধ্যমে একজন মানুষ প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়। আল্লাহ এসবের মাধ্যমে দান করেন আত্মিক প্রশান্তি- প্রতিটি আল্লাহ-ভোলা মানুষই যার শূন্যতায় ভোগে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সেসব ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন যারা এই সুবর্ণ সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করে। আমীন।

 


ট্যাগ :

আরো সংবাদ