বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০ ২৫শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

আমরা সকলের প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো, ইনশাআল্লাহ : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ২৫ মার্চ, ২০২০ ৮:২০ : অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদন : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২০ ‍উপলক্ষ্যে আজ ২৫শে মার্চ রাত ৭.৩০ টায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ দেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেল।ভাষণের বড় অংশ জুড়েই ছিল করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থা ও করনীয় নিয়ে দিকনির্দেশনা।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি এবং তাতে জনগণকে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের স্বাধীনতা দিবস এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সকলের প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো, ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব এখন আতঙ্কগ্রস্ত। এই ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উপদেশ আমাদের মেনে চলতে হবে। আমাদের যতদূর সম্ভব মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। যাঁরা করোনাভাইরাস-আক্রান্ত দেশ থেকে স্বদেশে ফিরেছেন, সেসব প্রবাসী ভাইবোনদের কাছে অনুরোধ -আপনাদের হোম কোয়ারেন্টাইন বা বাড়িতে সঙ্গ-নিরোধসহ যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন। নির্দেশনা। তিনি বলেন, মাত্র ১৪দিন আলাদা থাকুন। আপনার পরিবার, পাড়াপ্রতিবেশি, এলাকাবাসী এবং সর্বোপরি দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এসব নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। গত জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল। এটি এখন বিশ্বের ১৯৫টির মধ্যে ১৬৯ টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।গতকাল পর্যন্ত ৪ লাখ ২২ হাজার ৮শোরও বেশি মানুষ এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং ১৮ হাজার ৯০৭ জন মানুষ মারা গেছেন। ১ লাখ ৯ হাজার ১০২ জন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন।বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে প্যানডামিক বা মহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।আমি জানি আপনারা এক ধরনের আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যাঁদের আত্মীয়স্বজন বিদেশে রয়েছেন, তাঁরাও তাঁদের নিকটজনদের জন্য উদ্বিগ্ন রয়েছেন।আমি সকলের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু এই সঙ্কটময় সময়ে আমাদের ধৈর্য্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সরকার ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট আর্থিক মন্দা কাটানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। রপ্তানীমুখী শিল্পের জন্য ৫হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নির্বিঘ্নে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা শিথিল করা হয়েছে। অনগ্রহ কৃচ্ছতা সাধন করুন ও অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে বিরত থাকুন। আমাদের খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে। কৃষক ভাইদের বলবো, আপনারা কোন জমি পতিত রাখবেন না। অধিকহারে ফসল ফলান।

ঘরে ইবাদাত করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান ভাইয়েরা ঘরেই নামাজ আদায় করুন এবং অন্যান্য ধর্মের ভাই-বোনদেরও ঘরে বসে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় না যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ভাষণে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ রাখা এবং গতরাত (২৪ মার্চ) থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন, নৌযান এবং অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বন্ধ করাসহ দেশের সব স্কুল কলেজ ও কোচিং সেন্টার গত ১৭ই মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা; উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত; সব পর্যটন এবং বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ করা; যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি জানান, কাঁচাবাজার, খাবার ও ওষুধের দোকান এবং হাসপাতালসহ জরুরি সেবা কার্যক্রম চালু থাকবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখবে।‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২৪-এ মার্চ থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বলবৎ হয়েছে। এটি কার্যকর করতে জেলা প্রশাসনকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সহায়তা করছেন। আপনারা যে যেখানে আছেন, সেখানেই অবস্থান করুন।’

হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা করোনা ভাইরাস-আক্রান্ত দেশ থেকে স্বদেশে ফিরেছেন, সেসব প্রবাসী ভাই-বোনদের কাছে অনুরোধ – আপনাদের হোম কোয়ারেন্টিন বা বাড়িতে সঙ্গ-নিরোধসহ যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিম্নআয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা দেয়া হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেয়া হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভাসানচরে এক লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা নেবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গরিব মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবাও দেয়া হচ্ছে। আমি নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে আপনারা ইতোমধ্যেই জেনেছেন। তবু আমি কয়েকটি বিষয়ের কথা আবারও উল্লেখ করছি। দেশের সকল স্কুল, কলেজ ও কোচিং সেন্টার গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। সকল পর্যটন এবং বিনোদন কেন্দ্রও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ২৬-এ মার্চ থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত সব সরকারি-বেসরবারি অফিস বন্ধ থাকবে।যুগে যুগে জাতীয় জীবনে নানা সঙ্কটময় মুহূর্ত আসে। জনগণের সম্মিলিত শক্তির বলেই সেসব দুর্যোগ থেকে মানুষ পরিত্রাণ পেয়েছে। ইতোপূর্বে প্লেগ, গুটি বসন্ত, কলেরার মতো মহামারি মানুষ প্রতিরোধ করেছে। তবে ওইসব মহামারির সময় বিশ্ব এখনকার মতো ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল না। এতো বিপুলসংখ্যক মানুষ তখন একদেশ থেকে অন্য দেশে বা একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করতো না। এ কারণে করোনাভাইরাস দ্রুততম সময়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। সবাই মিলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালালে নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এ দুর্যোগ থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। আমরা জনগণের সরকার। সব সময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।

শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালি বীরের জাতি। নানা দুর্যোগে-সংকটে বাঙালি জাতি সম্মিলিতভাবে সেগুলো মোকাবিলা করেছে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সকলের প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো, ইনশাআল্লাহ।আবারও বলছি: স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সকলে যার যার ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ