সোমবার, ১ মার্চ ২০২১ ১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

আজ ইমাম গাজ্জালী (রহ.)’র পবিত্র ওফাত দিবস

প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ৭:২৮ : অপরাহ্ণ

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) এর প্রকৃত নাম আবু হামিদ মুহম্মদ। তাঁহার পিতার ও পিতামহের উভয়ের নামই মুহম্মদ। জন্মঃ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ (৪৫০ হিজরি)। তাঁহার মর্যাদাসূচক পদবী হুজ্জাতুল ইসলাম। খোরাসানের অন্তর্গত তুস জেলার তাহেরান নগরে গাজালা নামক স্থানে হিজরি ৪৫০ সনে, মুতাবেক ১০৫৮ খৃষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কোনো কোনো গবেষকের মতে তাঁর জন্মস্থান গাজালা এর নামানুসারে তিনি গাযালী উপাধি ধারণ করেন। ‘গাজ্জাল অর্থ হচ্ছে পশম। তাঁদের বংশানুক্রমিক পেশা ছিলো বুনন ও বিক্রয় করা। তাই কারো কারো মতে পেশাগত কারণে তাঁর এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছে। গাজ্জালীর পিতা ছিলেন ধর্মভীরু সুফী সাধক এবং জ্ঞান পিপাসু। তাঁদের বাড়িতে প্রায় সময়ই জ্ঞানী-গুণী ও সাধকদের জলসা বসতো। শৈশব থেকেই গাজ্জালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। একজন সুফী সাধকের কাছ থেকে তিনি কোরান, হাদিস ও অন্যান্য শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি জুরজান ও তুস নগরে গমন করেন। সেখানে তিনি পর্যায়ক্রমে আবু নসর ও শেখ আহম্মদ আল তুসীর কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। একবার জুরজান থেকে তুস নগরীতে যাওয়ার সময় তাঁর সমস্ত টাকা পয়সা ও বই পত্র ডাকাতরা কেড়ে নেয়। তিনি তাদের কাছে শুধুমাত্র বই-পত্রগুলো ফেরত চাইলে ডাকাতরা তাঁকে ঠাট্টা করে বলে, যার বিদ্যা পুঁথিতে আবদ্ধ সে আবার কিসের বিদ্বান? তুমি তো তাহলে আজ থেকে মুর্খই হয়ে গেলে। ঠিক তখন থেকেই গাজ্জালী প্রতিজ্ঞা করলেন এখন থেকে তিনি সমস্ত রকমের জ্ঞান মাথাতেই ধারণ করবেন, বই-পত্রে নয়। আবু নসর ইসমাইল এর কাছ থেকে গাজ্জালী কোরান, হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেন। তারপর তিনি ছুটে যান নিশাপুরে আরও জ্ঞান অর্জনের প্রত্যাশায়। সেখানে ছিলো তৎকালিন বিখ্যাত বিদ্যাকেন্দ্র নিযামীয়া মাদ্রাসা। গাজ্জালী ১০৭৭ সালে নিযামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি সুপন্ডিত মাআলী ইমামুল হারমায়েনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান লাভ করেন। তিনি পরিণত বয়সে ৪৮৪ হিজরিতে বাগদাদ গমন করেন। বাগদাদে তত্কালীন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নিযামিয়া মাদ্রাসায় তিনি অধ্যাপনায় যোগ দেন। মুসলিম দর্শন, ফিকাহ, ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব) বিষয়ে তিনি সর্বকালের প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীদের একজন। ইমাম গাজ্জালীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতি ছিল অগাধ তৃষ্ণা। নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপনা তার এই জ্ঞান পিপাসা নিবারণ করতে পারেনি। তাই অল্প সময়ের মধ্যে নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপনা ছেড়ে সৃষ্টি রহস্যের সন্ধানে তিনি পথে বেরিয়ে পড়েন। প্রায় দশ বছর তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে অবশেষে আবার তিনি বাগদাদে তিনি তৎকালীন দুনিয়ার বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় বাগদাদের নেজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রেকটর নিযুক্ত হন। নেজামুল মুলক তুসী মালিক শাহ সালজুকী ও বাগদাদের খলিফার দরবারে যোগ্য আসন লাভ করেন। সমকালীন রাজনীতিতে এত বেশী প্রভাব বিস্তার করেন যে, সালজুকী শাসক ও আব্বাসীয় খলিফার মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধ দুর করার জন্যে তাঁর খেদমত হাসিল করা হতো। পার্থিব উন্নতির এই পর্যায়ে উপনিত হবার পর অকস্মাৎতাঁর জীবনে বিপ্লব আসে। নিজের যুগের তত্ত্বগত নৈতিক ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও তমুদ্দুনিক জীবনধারাকে যত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন, ততই তাঁর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে এবং ততই বিবেক তারস্বরে শুরু করে যে, এই পুঁতিগন্ধময় সমুদ্রে সন্তরণ করা তোমার কাজ নয়, তোমার কাজ অন্য কিছু। অবশেষে সমস্ত রাজকীয় মর্যাদা, লাভ , মুনাফা, ও মর্যদাপূর্ণ কার্যসমূহেকে ঘৃণাভাবে দূরে নিক্ষেপ করেন। কেননা এগুলোই তার পায়ে শিকল পরিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর ফকির বেশে দেশ পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। বনে-জঙ্গলে ও নির্জন স্থানে বসে নিরিবিলিতে চিন্তায় নিমগ্ন হন। বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মুসলমানদের সংগে মেলামেশা করে তাদের জীবনধারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।।দীর্ঘকাল মোজাহাদা ও সাধনার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে থাকেন। ৩৮ বছর বয়সে বের হয়ে পূর্ণ দশ বছর পর ৪৮বছর বয়সে ফিরে আসেন। ওই দীর্ঘকালীন চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের পর তিনি যে কার্য সম্পাদন করেন তা হলো এই যে, বাদশাহদের সংগে সম্পর্কেচ্ছেদ করেন। এবং তাদের মাসোহারা গ্রহণ করা বন্ধ করেন। বিবাদ ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার জন্যে শপথ করেন। সরকারী প্রভাবাধীনে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তুসে নিজের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কায়েম করেন।

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)’র উপদেশমূলক কিছু বানীঃ
#তিনটি বস্তু মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। লোভ, হিংসা ও অহংকার।
#তিনটি অভ্যাস মানুষের জন্য সর্বমুখী কল্যাণ ডেকে আনে। আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, বিপদের সময় দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং যে কোন সংকটে ধৈর্য ধারণ করা।
#মানবজীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে তার ‘মন এবং জবানকে’ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে সমর্থ হওয়া।
#দুই ধরনের লোক কখনও তৃপ্ত হতে পারে না- জ্ঞানের অম্বেষী এবং সম্পদের লোভী।
#আয়নায় নিজের চেহারা দেখ, যদি সুদর্শন হও তবে পাপের কালিমা লেপন করে ওকে কুৎসিত করো না! আর যদি কালো-কুশ্রী হয়ে থাক, তবে ওকে পাপ-পঙ্কিলতা মেখে আরও বীভৎস করে তুলো না।
#আল্লাহর প্রত্যেকটি ফয়সালাই ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তিশীল। সুতরাং কোন অবস্থাতেই অভিযোগের ভাষা যেন তোমার মুখে উচ্চারিত না হয়।
#ক্রোধ মনুষ্যত্বের আলোকশিখা নির্বাপিত করে দেয়।
#শক্ত কথায় রেশমের মতো নরম অন্তরও পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
#সাফল্যের অপর নামই অধ্যবসায়।
#ইমাম_গাজ্জালী (রাঃ)’র একটি সুন্দর গল্পঃ

ইমাম গাজ্জালী (র:) একবার একটা গল্প বলছিলেন-
এক ব্যক্তি জঙ্গলে হাটছিলেন, হঠাৎ দেখলেন এক সিংহ তার পিছু নিয়েছে, তিনি প্রাণ ভয়ে দৌড়াতে লাগলেন, কিছু দূর গিয়ে একটা প্রাণহীন কুয়া দেখতে পেলেন, তিনি চোখ বন্ধ করে তাতে দিলেন ঝাপ, পড়তে পড়তে তিনি একটা ঝুলন্ত দড়ি দেখে তা খপ করে ধরে ফেললেন, এবং ঐ অবস্থায় ঝুলে রইলেন। উপরে চেয়ে দেখলেন সিংহটি তাকে খাওয়ার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছেন। নিচে চেয়ে দেখলেন বিশাল একটা সাপ তার নিচে নামার অপেক্ষায় চেয়ে আছে। বিপদের উপর আরো বিপদ হিসেবে দেখতে পেলেন একটি সাদা আর একটি কালো ইঁদুর তার দড়িটি কামড়ে ছিড়ে ফেলতে চাইছে, এমন হিমশিম অবস্থায় কি করবেন যখন বুঝতে পারছিলেন না তখন হঠাৎ তার সামনে কুয়ার সাথে লাগোয়া গাছে একটা মৌছাক দেখতে পেলেন। তিনি কি মনে করে সেই মৌচাকের মধুতে আঙ্গুল ডুবিয়ে তা চেটে দেখলেন। সেই মধুর মিস্টতা এত বেশি ছিল যে তিনি কিছু মুহুর্তের জন্য উপরের সিংহের গর্জন, নিচের হা করে থাকা সাপ আর দড়ি কাটা ইঁদুরের কথা ভুলে গেলেন। ফলে তার বিপদ অবশ্যম্ভাবি হয়ে দাড়ায়।
ইমাম গাজ্জালী (র:) এই গল্পের ব্যখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এই সিংহটি হচ্ছে আমাদের মৃত্যু, যে সর্বক্ষণ আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেই সাপটি হচ্ছে কবর, যা আমাদের অপেক্ষায় আছে। দড়িটি হচ্ছে আমাদের জিবণ, যাকে আশ্রয় করে বেচে থাকা। সাদা ইঁদুর হল দিন আর কালো ইঁদুর হল রাত, যারা প্রতিনিয়ত ধীরে ধীরে আমাদের জিবণের আয়ু কমিয়ে দিয়ে আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর সেই মৌচাক হল দুনিয়া, যার সামান্যা মিস্টতা আমাদের এই চতুর্মুখি ভয়ানক বিপদের কথা ভুলিয়ে রাখছে।
সুতরাং এই দুনিয়া চির দিনের জন্য নয়। একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। আমাদের জীবনের সকল রঙিন পরিচয় তখন মুছে যাবে।

ইমাম গাজ্জালি (রহ:) চারশ’র ও অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার অধিকাংশ বইগুলোতে ধর্মতত্ব, দর্শন ও সুফিবাদ আলোচনা করেছেন।ইমাম আল গাজ্জালি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তার চিন্তাধারাকে মুসলিম ধর্মতত্ত্বের বিবর্তন বলে ধরা হয়।
#ওফাতঃ এই মহামনীষী খ্রিস্টাব্দ ১১১১ সনের ডিসেম্বর মাস মোতাবেক ৫০৫ হিজরির ১৪ জমাদিউস সানী নিজ জন্মভূমি তুস নগরীতে সুস্থ অবস্থায় ওফাত লাভ করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মৃত্যুর দিন ভোর বেলায় তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং তার ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে নিজ হাতে কাফনের কাপড় পরিধান করেন এবং কেবলার দিকে মুখ করে শুয়ে পড়েন।
তথ্যসূত্রঃ
মাসিক_তরজুমান
ইউকিপিডিয়া


ট্যাগ :

আরো সংবাদ