শনিবার, ৬ মার্চ ২০২১ ২১শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

অসহায় শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব

প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ৮:৩২ : অপরাহ্ণ

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই:‘পৌষ গেল, মাঘ আইল শীতে কাঁপে বুক/দুঃখীর না পোহায় রাতি হইল বড় দুখ।’ গ্রামবাংলার এ প্রবাদটিই তুলে ধরে আমাদের দেশের অসহায় হতদরিদ্র মানুষদের শীতকালীন দৃশ্য। সৃষ্টিকর্তার অপার ইচ্ছায় ও প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঋতুর পালাবদল ঘটে। এই পালা বদলের হাত ধরেই চলে এসেছে শীত। আর দিন যত যাচ্ছে শীতের দাপট ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে হিমশীতল কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে দেশ। শীত বিত্তবান মানুষদের জন্য যেমন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, তেমন দিন এনে দিন খাওয়া বস্ত্রহীন মানুষদের জন্য একটি গরম কাপড়ের হাহাকার নিয়ে আসে। মূলত আমাদের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। অনেকেরই শীতের সময় প্রয়োজনীয় গরম কাপড় কিংবা কম্বল কেনার সামর্থ্য হয় না। বিশেষ করে পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষরা। ওদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। খোলা পরিবেশে নিদারুণ শীতে কাঁপতে থাকে কঙ্কালসার দেহ। ফিনফিনে পাতলা কাপড় ভেদ করা হিম শীতল বায়ুতে জমে যায় রুগ্ন শরীর। নির্ঘুম রাত তবু পোহাতে চায় না। আর এতেই অনেককে মৃত্যুবরণও করতে হয়। এখন মাঘ মাস শুরু আর মাঘের শুরুতেই জেঁকে বসেছে শীত। হিমশীতল কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে দেশ, কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত। শ্রমজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হতে বেশ কষ্ট পাচ্ছে। অনেকে টাকার অভাবে কিনতে পারছে না শীতবস্ত্র। গরম কাপড়ের অভাবে করুণ দশা অনেকের। দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য শীতকাল বড়ো কষ্টের। খাবারের চেয়েও তাদের শীত নিবারণ এখন অতীব প্রয়োজন। শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থাও তাদের নেই। যদিও কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় হাড়কাঁপানো শীতের কারণে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বিত্তবানদের অনেকেই ঘরের বাইরে বের হন না। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে জীবিকার তাগিদে প্রচ- ঠান্ডায়ও ঘরের বাইরে যেতে হয়। তীব্র শীতে বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছায়। এ সময় বেড়ে যায় জ্বর, শ্বাসকষ্ট, সর্দি, কোল্ড ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ। ফুটপাত এবং খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারীদের কষ্টের সীমা থাকে না। সাধারণত সমাজের সংগতিসম্পন্ন ও সচ্ছল মানুষের ঘরে বছর পরিক্রমায় শীতকাল ঋতু হিসেবে আনন্দ ও খুশির বার্তাবহ হলেও দেশের বৃহত্তর জনজীবনে শীত নৈরাশ্য ও বেদনার ধূসর বার্তাবাহক মাত্র। কেননা হাড়কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবনে শৈত্যপ্রবাহ থেকে বাঁচার জন্য অসহায় দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন অনেক শীতবস্ত্রের। শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে হলেও প্রয়োজন সুচিকিৎসা ও ওষুধপথ্য এবং শীত মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারিভাবে কার্যকর উদ্যোগ। বিশেষ করে শিশুরা গণহারে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের সুচিকিৎসার ব্যাপারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিলে শীতের দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি শীতজনিত মৃত্যুর হারও বাড়বে। তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত-নির্বিশেষে সমাজের ধনাঢ্য ও বিত্তবান ব্যক্তিদের শীতার্ত বস্ত্রহীন মানুষের পাশে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। একটু চোখ মেলে তাকালেই দেখি বাইরে কনকনে শীত, কুয়াশায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। কেউ অট্টালিকায় আরামে ঘুমে বিভোর, কেউ রাস্তার পাশে আবার কেউবা রেলস্টেশনে বা বাসস্ট্যান্ডে কোনো রকমে একটা গরম কাপড়ে রাতযাপন করছেন। কেউবা আবার গরম পোশাক না পেয়ে সারা রাত আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। এটিই কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তব চিত্র। এ চিত্র বদলাতে পারি আমরাই। আসুন, আমরা সাধ্যমতো শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই। এটি আমাদের মানবিক দায়িত্ব। আমাদের দায়িত্ববোধই পারে অসহায়ের সহায় হতে।
ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের প্রকোপে নিদারুণ কষ্ট ও দুঃসহ অবস্থায় পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখ লাখ দুস্থ, নিঃস্ব, ছিন্নমূল, গরিব, দুঃখী, বস্ত্রহীন, শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ। প্রচ- শীতে যানবাহন চলাচল, পণ্যদ্রব্য ও পত্রিকা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ, তরিতরকারি আবাদ। অনেকেই ভুগছেন সর্দি, কাশি, জ্বর, পেটের পীড়া, আমাশয়, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট বেড়েছে বহুগুণ। হাড় কাঁপানো শীতে যে বিপুল জনগোষ্ঠী বর্ণনাতীত দুঃখ-কষ্টে দিন যাপন করছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মীয় এবং মানবিক উভয় দিক মানুষ এবং মানবতার কথা বলে। যেকোনো বিপদে মানুষের পাশে থাকার কথা বলে। আমরা সবাই যার যার জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব মানবতার পাশে দাঁড়ালে কোনো মানুষ পথে-ঘাটে আর্তনাদ করবেন না। পৃথিবী হবে সুখময়, শান্তিময়।
এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানো সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। গরিব-দুস্থরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও প্রাপ্য। আসুন আমরা মানবিক মূল্যবোধ থেকে মিলেমিশে ফুটপাতে বা খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী অসহায় মানুষের শীত নিবারণে হাত বাড়িয়ে দেই। আর যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, তাদের দুরবস্থা যে সর্বাধিক, সে কথা বলাই বাহুল্য। বিত্তবান মানুষ শীতবস্ত্র ব্যবহার করে পরিত্রাণ পেলেও দরিদ্র লোকেরা শীতবস্ত্রের অভাবে সীমাহীন কষ্টে দিনাতিপাত করছে। হাড়কাঁপানো শীতে যে বিপুল জনগোষ্ঠী বর্ণনাতীত দুঃখ-কষ্টে-অনাহারে ও অর্ধাহারে দিনযাপন করছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কেননা ক্রয়ক্ষমতার বাইরে শীতার্ত ব্যক্তিরা না পারে পেট ভরে খাবার খেতে, না পারে কোনো অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে। রাতের বেলায় দেখা যায় কীভাবে, কেমন করে শীতবস্ত্রবিহীন মানুষ কষ্টে রাতযাপন করছে। তাদের নেই কোনো শীত নিবারণ করার সম্বল। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে শীতের তীব্রতায় দুস্থ, নিঃস্ব, ছিন্নমূল, গরিব, দুঃখী, বস্ত্রাভাবী শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নিদারুণ কষ্ট পায়। তাই সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরা যদি ইচ্ছা করেন, তাঁদের নিজ নিজ জেলার শীতার্ত অসহায় গরিব-দুঃখী মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করতে ।
সুতরাং প্রত্যেক মানুষেরই পারস্পরিক মানবতাবোধ ও উদার মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। একজন মানুষ বিপদে পড়লে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসহায় হলে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা সমাজের বিত্তবান প্রতিবেশীদের দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্য। সব মানুষের উচিত সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দয়া-মায়া, অকৃত্রিম ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি বজায় রাখা। তাই দেশের সর্বস্তরের ধনাঢ্য, বিত্তবান, শিল্পপতি ব্যবসায়ীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা চলতি শীত মৌসুমে শীতার্ত গরিব, অসহায়, দুঃখী মানুষকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পাড়া-মহল্লায় নতুন বা পুরোনো কিছু শীতবস্ত্র বিতরণে অকাতরে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করুন। আর সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালীরা এ সকল শীতার্ত মানুষের প্রতি সাহায্য ও সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করলেই এ থেকে তারা মুক্তি পেতে পারে। পর্যাপ্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র সরবরাহ করে সাধ্যমতো শীতার্তদের পাশে এসে দাঁড়ানোর মত মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এলেই শীত নিবারণের পাশাপাশি তাদের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব।

  লেখক: প্রাবন্ধিক ও মরমী গবেষক।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ