রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

২০২০ সালে যাদের হারিয়েছে বাংলাদেশ

প্রকাশের সময় : ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ ৯:৫৫ : অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট: দুই হাজার বিশ সালকে অনেকেই নাম দিয়েছে ‘দুই হাজার বিষ’। কারণও সঙ্গতই। ২০২০ সাল ছিলো মহামারির বছর। এবছর মৃত্যুর মিছিল ছিল দীর্ঘ।। রাজনীতি, চলচ্চিত্র, শিক্ষা, সাহিত্য, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক নক্ষত্র চিরতরে হারিয়ে গেছে এ বছর। তাদের স্মরণে দিনবদলবিডি.কমের আয়োজন।
ফজিলাতুন্নেসার বাপ্পি

বছরের দ্বিতীয় দিনেই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রথম শোকের খবর আসে সাবেক সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসার বাপ্পির আকস্মিক মৃত্যুতে। নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চার দিন পর ২ জানুয়ারি তার মৃত্যু ঘটে। পরে নমুনা পরীক্ষায় তার সোয়াইন ফ্লু সংক্রমণের বিষয়টি ধরা পড়ে।

পেশায় আইনজীবী বাপ্পির বয়স হয়েছিল ৪৯ বছর। যুব মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর নবম ও দশম সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন তিনি।

হাবিবুর রহমান মোল্লা

ঢাকা-৫ (ডেমরা-দনিয়া-মাতুয়াইল) আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা ৭৮ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ৬ মে মারা যান।

ডেমরা এলাকায় দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন হাবিবুর রহমান মোল্লা। আওয়ামী লীগ করলেও ১৯৯১ সালে প্রথমবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে জয়ী হন। এরপর ২০০৮ থেকে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

মোহাম্মদ নাসিম

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ব্রেইন স্ট্রোকে ১৩ জুন চিরতরে বিদায় নেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে নাসিম ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে মনসুর আলী হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন তিনি।

১৯৮৬ সাল থেকে ছয় বার সিরাজগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম। ১৯৯১ সালের সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকারে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ ১৩ জুন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

আওয়ামী লীগের সাবেক ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ আব্দুল্লাহ গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আসনে তার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন শেখ আব্দুল্লাহ।

তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় ২০১৮ সালে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জুন মারা যান।

২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর ২০০৩ সালে প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন কামরান।

১৯৮৯ সাল থেকে সিলেট শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন কামরান। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ পান।

সাহারা খাতুন

দেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেওয়া সাহারা খাতুন ৯ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

তৃণমূল থেকে লড়াই করে রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসা সাহারা খাতুন আইন পেশায় থেকেই আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন। বিয়ে-সংসারের প্রথাগত পথে না গিয়ে তিনি নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ আন্দোলন-সংগ্রাম ও দলের দুর্দিনে আজীবন মাঠে ছিলেন সক্রিয়।

২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন, পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দ্বায়িত্ব দেওয় হয় তাকে।

ঢাকা-১৮ সংসদীয় আসন থেকে নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন সাহারা খাতুন।

শওকত আলী

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শওকত আলী ৮৪ বছর বয়সে গত ১৬ নভেম্বর মারা যান।

পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিল, তাতে শওকত আলীকে ২৬ নম্বর আসামি করা হয়।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদে দ্বায়িত্ব পালন করা শওকত আলী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর আবার সেনাবাহিনীতে ফেরেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর শওকত আলীকে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয়।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়া হন এবং শরীয়তপুর-২ আসন থেকে ছয় বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিসংহতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ৭১ ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।

শাহজাহান সিরাজ

মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী শাহজাহান সিরাজ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৭৭ বছর বয়সে ১৪ জুলাই মারা যান।

ছাত্রলীগ, জাসদ ও পরে বিএনপির নেতা হয়ে শাহজাহান সিরাজ মন্ত্রী হলেও একাত্তর সালে উত্তাল মার্চে ছাত্র সমাজের পক্ষে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে নাম লেখা থাকবে তার।

টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া শাহজাহান সিরাজ স্বাধীতার আগে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ‘চার খলিফা’র একজন হিসেবে খ্যাত তিনি। স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে জাসদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। এরপর জাসদের নানা ভাঙনের মধ্যে নিজে একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। গত শতকের ৯০ এর দশকে এসে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর সময় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

তিনি ১৯৭৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাসদ থেকে। এরপর ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের সংসদেও জাসদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে কিছু দিন কারাগারে থেকে মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে আর রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি শাহজাহান সিরাজ।

ইসরাফিল আলম

করোনাভাইরাস সংক্রমণ মুক্ত হওয়ার পর ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে ২৭ জুলাই মারা যান নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম। তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর।

তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে মিটার রিডার হিসেবে চাকরি করতেন ইসরাফিল আলম। সেখানেই তিতাস কর্মচারী ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের মাধ্যমে তার রাজনীতির শুরু। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে অটোটেম্পো চালক শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে তিনি তিতাস গ্যাস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের উপদেষ্টা এবং জাতীয় ঘাট শ্রমিক লীগের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইসরাফিল। সেই থেকে টানা তিন বার এমপি হন তিনি।

আবদুল মান্নান

সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ৬৬ বছর বয়সে ১৮ জানুয়ারি চিরবিদায় নেন। ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতি এক সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

বগুড়ার বাসিন্দা মান্নান গত শতকের ৮০ দশকে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (বাকসু) ভিপি ছিলেন তিনি।

২০০৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মান্নান। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও নির্বাচিত হন তিনি।

ইসমাত আরা সাদেক

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সামলানো ইসমাত আরা সাদেক ২১ জানুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে যান।

যশোর-৬ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ওই আসনে এক সময় তার স্বামী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএইচএসকে সাদেক সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল ইসমাত আরাকে। পরে তাকে করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী।

রহমত আলী

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট রহমত আলী ৭৫ বছর বয়সে ১৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রহমত আলী গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর-ভাওয়ালগড়-পিরুজালী-মির্জাপুর) আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০১ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মেয়ে রুমানা আলী টুসী একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি।

শামসুর রহমান শরীফ ডিলু

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা শামসুর রহমান শরীফ ডিলু ৮৪ বছর বয়সে ২ এপ্রিল মারা যান। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডিলু ওই এলাকা থেকে পাঁচ বার নির্বাচিত হন। আমৃত্যু পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। একাত্তরে ৭ নম্বর সেক্টর থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

তৃণমূল পর্যায়ের নেতা হিসেবে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন ডিলু। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে ১৯৯৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কখনও ভোটে হারেননি তিনি। ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

রাখী দাশ পুরকায়স্থ

দেশের নারী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, মুক্তিযোদ্ধা রাখী দাশ পুরকায়স্থ ৬৮ বছর বয়সে ৬ এপ্রিল চিরবিদায় নেন। লিভারের চিকিৎসা নিতে ভারতের আসামে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী রাখী দাশ ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্র সংসদে পরপর তিনবার ভিপি নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী শামসুন্নাহার হল ছাত্র সংসদেরও ভিপি ছিলেন।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সাবেক যুগ্ম সচিব রাখী দাশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার স্বামী পঙ্কজ ভট্টাচার্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের নেতা।

মকবুল হোসেন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪ মে মারা যান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ঢাকার সাবেক সংসদ সদস্য হাজি মকবুল হোসেন।

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর আসনের সংসদ সদস্য মকবুল আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদে সদস্য ছিলেন।

করোনাভাইরাস সঙ্কটের মধ্যেই মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছিলেন মকবুল। এরমধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরীক্ষা করে তার কোভিড-১৯ সংক্রমণ ধরা পড়ে।

শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মালিক মকবুল হোসেন সন্ধানী লাইফ ইন্সুরেন্স, পূরবী জেনারেল ইন্সুরেন্স কোম্পানিরও মালিক। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা মকবুল মোহাম্মদপুরে নিজের নামে একটি কলেজসহ আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে এ্যমিকো ল্যাবরেটরিজ, পান্না টেক্সটাইল, মোনা ফিন্যান্স ইত্যাদি।

চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ৮০ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭ ডিসেম্বর মারা যান।

মুসলিম লীগের এক সময়ের প্রতাপশালী নেতা ফরিদপুরের ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়ার ছেলে কামাল ইবনে ইউসুফ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

জিয়াউর রহমানের সময়ে ১৯৭৯ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়া কামাল ইবনে ইউসুফ ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফরিদপুর-৩ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সময় স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এই বিএনপি নেতা। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে কামাল ইবনে ইউসুফকে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী ছিলেন।

এম এ হাসেম

পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এম এ হাসেম ৭৮ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ডিসেম্বর মারা যান।

ব্যবসায়ী হাসেম ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি, মুক্তি পেয়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।

অর্ধ শতক আগে তামাক দিয়ে ব্যবসা শুরু করা হাসেম গত পাঁচ দশকে তার বাণিজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছেন আবাসন, আমদানি-রপ্তানি, পার্টিকেল বোর্ড, ইস্পাত, প্লাস্টিক, ভোগ্যপণ্য, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন খাতে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হাসেম এক সময় সিটি ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। জনতা ইনসুরেন্স কোম্পানিও তিনি গড়ে তোলেন।

হায়দার আনোয়ার খান জুনো

কমিউনিস্ট নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আনোয়ার খান জুনো ২৯ অক্টোবর হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

কমিউনিস্ট নেতা হায়দার আকবর খান রণোর ছোট ভাই জুনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করলেও বাম ধারা রাজনীতিকেই তিনি পেশা হিসেবে নেন। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া জুনো ছিলেন চীনপন্থি শিবিরে। ১৯৭০ সালে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলে তিনি এর সভাপতির দায়িত্ব নেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন জুনো। পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র জুনো তখন বোমা তৈরির কাজ করছিলেন।

স্বাধীনতার পর জুনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রগতিশীল গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতেও ভূমিকা রেখেছেন। গণ-সংস্কৃতি ফ্রন্টের সভাপতি ছিলেন তিনি।

আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন ৭৩ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ডিসেম্বর মারা যান।

তিনি পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ১৯৯৬ সালের সরকারে বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আ খ ম জাহাঙ্গীর ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮১-৮৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

দুঃসময়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেওয়া আ খ ম জাহাঙ্গীর ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আওয়ামী লীগে সংস্কারপন্থিদের দলে ভিড়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা হারিয়েছিলেন। পরে তিনি নিজের কাজের জন্য ‍ভুল স্বীকার করলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় নৌকার মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হন। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন না পেলেও তাকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়েছিল।

সুফিয়া আহমেদ

ভাষাসৈনিক ও দেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ ৮৭ বছর বয়সে ১০ এপ্রিল মারা যান। তিনি বার্ধ্যক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভেঙে যে মিছিল বের হয়, তার অগ্রসেনানী ছিলেন এই নারী। ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য ২০০২ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিচারপতি মুহাম্মদ ইব্রাহিমের মেয়ে সুফিয়া আহমেদ। তার স্বামী ছিলেন দেশের খ্যাতিমান আইনজীবী, তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ।

সা’দত হুসাইন

মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইন ৭৩ বছর বয়সে ২২ এপ্রিল মারা যান। তিনি কিডনির জটিলতাসহ নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।

দক্ষ আমলা হিসেবে পরিচিত সা’দত হুসাইন পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে প্রবাসী সরকারে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদের সচিব ছিলেন। ২০০৭ থেকে পাঁচ বছর তিনি পিএসসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

রোজিনা আক্তার

বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম নারী ক্যামেরাপারসন রোজিনা আক্তার ২৪ এপ্রিল মারা যান। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ ক্যামেরাপারসন পদে কর্মরত ছিলেন।

সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় জটিলতা দেখা দিলে তার জেরে রোজিনার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগের মাসে একটি সন্তান হয়েছিল তার, ওই নবজাতক বাঁচেনি: তখন থেকে তিনিও অসুস্থ ছিলেন।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথমে প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দিলেও পরে ক্যামেরাপারসন হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন রোজিনা।

জামিলুর রেজা চৌধুরী

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে যেসব বড় বড় ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ২৮ এপ্রিল চিরবিদায় নেন। ৭৭ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করা জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন।

বুয়েট থেকে অবসরে যাওয়ার পর ২০০১ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। মৃত্যুর সময় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য ছিলেন।

১৯৯৩ সালে যাদের হাত দিয়ে বাংলাদেশের ইমারত বিধি তৈরি হয়েছিল, এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তাদের একজন। বঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।

দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে অবদানের জন্য ২০১৭ সালে সরকার তাকে একুশে পদক দেয়। ২০১৮ সালের জুনে আরও দুইজন শিক্ষকের সঙ্গে তাকেও জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করা হয়।

ওই বছরই জাপান সরকার জামিলুর রেজা চৌধুরীকে সম্মানজনক ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান, গোল্ড রেইস উইথ নেক রিবন’ খেতাবে ভূষিত করে। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।

আনিসুজ্জামান

কোভিড-১৯ মহামারীতে যখন ধুঁকছে জাতি, সেই সময় ১৪ মে চিরবিদায় নেন দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ‘বাতিঘর’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ৮৩ বছর বয়সী এই অধ্যাপক বার্ধক্যজনিক জটিলতায় ভুগছিলেন, এর মধ্যে তারও করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকে ভূষিত ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ভারত সরকারের পদ্মভূষণ খেতাবও পান তিনি।

১৯৫২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আনিসুজ্জামান বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?’ শিরোনামে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম পুস্তিকা রচনা করেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জাতির এগিয়ে চলার পরতে পরতে ছাপ রাখার পর চূড়ান্ত বিকাশের দলিলও লিপিবদ্ধ হয়েছে তার হাতের ছোঁয়ায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানের ইংরেজি খসড়া তৈরি হয় কামাল হোসেনের নেতৃত্বে, বাংলায় অনুবাদ করেন আনিসুজ্জামান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপকের পরিচয় ছাপিয়ে সাহিত্য-গবেষণা, লেখালেখি, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সঙ্কটকালে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের জন্য অনেকের চোখে তিনি ছিলেন ‘জাতির অভিভাবক’।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

গত শতকের ৫০ দশক থেকে যারা সৃজনশীলতা দিয়ে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছিলেন, তাদের একজন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ২৩ মার্চ চিরবিদায় নেন। ৮৪ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক শিক্ষক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিল্প সমালোচনা, সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য।

ছোটগল্পে অবদানের জন্য ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান; শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য ২০০৯ সালে পান একুশে পদক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেন বোরহানউদ্দিন জাহাঙ্গীর।

আজাদ রহমান

আজাদ রহমানের সুর সাধনা থেমে যায় ১৬ মে; ৭৬ বছর বয়সে। হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পীর।

বাংলাদেশে খেয়াল জনপ্রিয় করার পেছনে আজাদ রহমানের অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি বেশ কিছু দিন নজরুল ইনস্টিটিউটেও পড়িয়েছেন।

‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’র মতো কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানে সুরটি আজাদ রহমানই বেঁধেছেন। চলচ্চিত্রে অনেক গানের সুরস্রষ্টা হিসেবে তিনি ছিলেন জনপ্রিয়ও। ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘মনেরও রঙে রাঙাব’, ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’সহ অনেক গানে সুর দিয়েছেন তিনি।

আজাদ রহমানের জন্ম ১৯৪৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি কীর্তন, ধ্রুপদী সঙ্গীতের পাশাপাশি খেয়াল, টপ্পার চর্চা করেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন আজাদ রহমান।

১৯৬৩ সালে কলকাতার ‘মিস প্রিয়ংবদা’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার মধ্য দিয়ে আজাদ রহমানের চলচ্চিত্রে আগমন। সেই চলচ্চিত্রে তার সুরে কণ্ঠ দেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখার্জি ও প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবুল চৌধুরীর ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রের গানে সুর দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে শুরু হয় আজাদ রহমানের পথ চলা।

হাসান ইমাম

নৃত্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক হাসান ইমাম ৬৭ বছর বয়সে ১৬ মে মারা যান। পরিবার জানায়, হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়। করোনাভাইরাসে বোনের মৃত্যুর তিন দিন পর তার মৃত্যু ঘটে।

দেশের নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে অগ্রগন্য হাসান ইমাম টেলিভিশন নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাবেক সভাপতি; সুরঙ্গমা একাডেমি নামে একটা নাচের স্কুল পরিচালনা করতেন।

বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া হাসান ইমামের শৈশব-কৈশোর কেটেছে মগবাজারে; স্বাধীনতার পরপর বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নৃত্যের উপর পড়াশোনা সম্পন্ন করে পেশাদার নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েন। আশি ও নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় এ নৃত্যশিল্পী পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ নৃত্য-নাটকে কাজ করে প্রশংসিত হয়েছেন; তার বিপরীতে ছিলেন নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতউল্লাহ।

আরেক নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপার সঙ্গে জুটি বেঁধে বেশকিছু নাটক করেছেন তিনি; পরবর্তীতে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে নিপার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নাচ থেকে ক্রমান্বয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন হাসান ইমাম।

মজিবর রহমান দেবদাস

পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়নের প্রতিবাদে যিনি জানিয়েছিলেন নাম বদলে, নিভৃতচারী সেই মজিবর রহমান দেবদাস ১৮ মে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। ৯২ বছর বয়সে জয়পুরহাটের ভাদসা ইউনিয়নের মহুরুল গ্রামে নিজের বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু ঘটে।

মজিবর রহমানের জন্ম ১৯২৮ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বগুড়া ও কুমিল্লার দুটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে মেলবোর্নে যান উচ্চতর শিক্ষার জন্য। ফিরে এসে তিনি যোগ দেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে সেখান থেকে চলে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, যোগ দেন গণিত বিভাগে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশের অনেক হিন্দু যখন জীবন বাঁচাতে মুসলমান নাম নিচ্ছিলেন, তখন নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘দেবদাস’ রাখেন মজিবর রহমান।

এরপর মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। তাদের বর্বরতায় অধ্যাপক দেবদাস মানসিক ভারসাম্য হারান। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি অধ্যাপনা থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান ১৯৭৩ সালে।

অবসর গ্রহণের পর বাড়িতে একরকম নিভৃতেই দিন কাটছিল তার। পরে ১৯৯৭ সালে সাংবাদিক হাসিবুল আলম প্রধান তাকে খুঁজে বের করেন। ১৯৯৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগ তাকে সম্মাননা জানায়।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর ২০১৫ সালে এই গুণীকে একুশে পদক দিয়ে সম্মান জানায় সরকার।

নিলুফার মঞ্জুর

প্রায় সাড়ে চার দশক অগণিত শিক্ষার্থীকে জীবন পথের দিশা দেখিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৬ মে ঢাকার সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর মারা যান।

বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী নিলুফার ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকার সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন দেশের অন্যতম সেরা ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

নিলুফারের বাবা ডা. মফিজ আলী চৌধুরী ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

আবদুল মোনেম

বাংলাদেশের বড় বড় অবকাঠামো তৈরিতে যে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে, সেই মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোনেম ৩১ মে মারা যান। ৮৬ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ীর ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিল।

বাংলাদেশে ছোট থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে মোনেম বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। নির্মাণ খাতের ব্যবসার সাফল্য তাকে বড় উচ্চতায় নিয়ে যায়।

মোনেমের নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস লিমিটেড দেশের অন্যতম শীর্ষ কন্সট্রাকশনস ফার্ম। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভারসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজে যুক্ত এএমএল কন্সট্রাকশনস পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও বিভিন্ন কাজে জড়িত।

মোনেম গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইগলু আইসক্রিম, ম্যাংগো পাল্প প্রোসেসিং, ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালসন, ইগলু ডেইরি প্রোডাক্টস, সুগার রিফাইনারি, এম এনার্জি লিমিটেড, নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, এএম আসফল্ট এ্যান্ড রেডিমিক্স লিমিটেড, এএম অটো ব্রিকস, এএম ব্র্যান অয়েল কোম্পানি, সিকিউরিটিজ ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং এএম বেভারেজ। এএম বেভারেজ ইউনিটের অধীনে কোকাকোলা ব্রান্ডের কোকাকোলা, ফান্টা ও স্প্রাইট বোতলজাত করে আসছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড।এ গ্রুপের মালিকানাধীন আব্দুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে।

ক্রীড়ামোদী মোনেম ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম পর্যন্ত ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ছিলেন।

এন আই খান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম খান বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে ৬ জুন মারা যান।

এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এন আই খান নামেই পরিচিত ছিলেন।

ঢাকা মেডিকেল থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সিটি ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাইফুল আজম

যুদ্ধক্ষেত্রে বৈমানিক হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনী কর্তৃক ‘লিভিং ঈগল’ স্বীকৃতিধারী সাইফুল আজম ৮০ বছর বয়সে ১৪ জুন মারা যান।

১৯৬৭ সালের তৃতীয় আরব-ইসরায়েলি ছয় দিনের যুদ্ধে তিনি চারটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। নিজ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়তে না পারলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিমানবাহিনীতে কাজ করেন তিনি।

সাইফুল আজম বাংলাদেশের পাবনা-৩ আসন থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে দুবার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ছিলেন।

কামাল লোহানী

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতারে যার কণ্ঠে বাংলাদেশের যুদ্ধ জয়ের খবর প্রথম এসেছিল, সেই কামাল লোহানীর কণ্ঠ গত ২০ জুন করোনাভাইরাসে স্তব্ধ হয়ে যায়।

কামাল লোহানী একাধারে ছিলেন সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক, রাজনৈতিক সংগ্রামের পরামর্শক।

ছেলেবেলায় বাঙালির ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার পর বাঙালির প্রতিটি সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন তিনি। কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিশ্বাসী কামাল লোহানী ১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একাত্তরে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি; যুদ্ধ শুরুর পর স্বাধীন বাংলা বেতারে যুক্ত হন।

১৯৬২ সালে কামাল লোহানী ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন তার রাজনৈতিক আদর্শের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন কামাল লোহানী। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর দুই দফা মহাপরিচালক ছিলেন।

দৈনিক আজাদ, সংবাদ, জনপদ, বঙ্গবার্তা, পূর্বদেশ, বাংলার বাণী, দৈনিক বার্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করে আসা কামাল লোহানী সাংবাদিকতার জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

খোন্দকার মোজাম্মেল হক

এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনামলে ‘গেদু চাচার খোলা চিঠি’ কলাম লিখে জনপ্রিয় সাংবাদিক খোন্দকার মোজাম্মেল হক ২৯ জুন মারা যান। করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়েই প্রবীণ এই সাংবাদিকের মৃত্যু হয়।

গত শতকের ৮০ এর দশকে সুগন্ধা নামে একটি সাপ্তহিক প্রকাশিত হত খোন্দকার মোজাম্মেলের সম্পাদনায়। সেখানে ‘গেদু চাচার খোলা চিঠি’ নামে একটি কলাম লিখতেন তিনি, যাতে সরস কথায় সামরিক শাসনের সমালোচনা করা হত। ওই সময় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল গেদু চাচার খোলা চিঠি।

খোন্দকার মোজাম্মেল হক পরে সূর্যোদয় নামে আরেকটি সাপ্তাহিকও প্রকাশ করেন। এরপর আজকের সূর্যোদয়ও বের হয় তার সম্পাদনায়।

লতিফুর রহমান

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ৭৫ বছর বয়সে ১ জুলাই মারা যান।

ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক মান রক্ষার জন্য ২০১২ সালে অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড পান তিনি।

বাবার পাটকলে কর্মজীবন শুরু করে পরে বিভিন্ন ব্যবসায় নিজেকে যুক্ত করেন লতিফুর রহমান। তার গড়া ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চা, বেভারেজ, মিডিয়া, বীমাসহ নয়টি খাতে।

দৈনিক প্রথম আলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াস্টার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন লতিফুর রহমান। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক তিনি। মিডিয়াস্টার এবিসি রেডিও এবং মিডিয়াওয়ার্ল্ড সাপ্তাহিক ২০০০ এরও মূল মালিক প্রতিষ্ঠান।

এন্ড্রু কিশোর

কয়েক দশক ধরে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে গানের জগতে আধিপত্য করে আসা এন্ডু কিশোরের জীবনের গল্প থেকে যায় ৬ জুলাই; ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ৬৪ বছর বয়সেই পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হয় তাকে।

জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে, সবাই তো ভালবাসা চায়, ভালবেসে গেলাম শুধু, ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা, বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে, পড়ে না চোখের পলক- তার এমন অনেক গান এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

এন্ড্রু কিশোরের জন্ম রাজশাহীতে, শৈশব ও কৈশোরও কাটান সেখানে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা হাল ছেড়ে দিলে দেশে এসে রাজশাহীতেই ছিলেন, সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

এন্ড্রু কিশোর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনায় পড়লেও গানই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। গানের নেশায় ছুটে আসেন রাজধানী ঢাকায়। চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালে; মেইল ট্রেন-এ আলম খানের সুরে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৯ সালে প্রতিজ্ঞা চলচ্চিত্রের ‘এক চোর যায় চলে’ গান গাওয়ার পর আর পেছনে ফিরতে হয়নি তাকে। গান গেয়ে আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেন তিনি।

বাংলাদেশে প্লেব্যাকে শীর্ষে থাকা অবস্থায় বলিউডের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মনের ডাকও পেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর, কিন্তু ভারতে থিতু হতে চাননি তিনি।

নুরুল ইসলাম বাবুল

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল ১৩ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া নুরুল ইসলাম বাবুল ১৯৭৪ সালে যমুনা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। একে একে শিল্প ও সেবা খাতে গড়ে তোলেন তিন ডজন কোম্পানি।

ঢাকার বারিধারায় যমুনা ফিউচার পার্ক এবং নির্মাণাধীন মেরিয়টস হোটেলের মালিকানাও রয়েছে যমুনা গ্রুপের হাতে। দৈনিক যুগান্তর ছাড়াও যমুনা টেলিভিশন যমুনা গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান।

বাবুলের স্ত্রী সালমা ইসলাম একজন সংসদ সদস্য। জাতীয় পার্টির নেতা সালমা এর আগে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

এমাজউদ্দীন আহমদ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ৮৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭ জুলাই মারা যান।

১৯৯২-৯৬ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন সর্বশেষ ইউনির্ভাসিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) উপাচার্য ছিলেন।

বিএনপিতে কোনো পদে না থাকলেও খালেদা জিয়ার একজন পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এমাজউদ্দীন। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত শত নাগরিক কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন এমাজউদ্দীন।

১৯৯২ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রের অবদানের জন্য একুশে পদক পান তিনি।

এমাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯৩২ সালে অবিভক্ত বাংলার মালদহে। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এমাজউদ্দীন ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।

রাজশাহী কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে এমাজউদ্দীনের পেশাজীবনের শুরু। পরে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ফিরে ১৯৭০ সলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন।

আলাউদ্দিন আলী

ঢাকাই চলচ্চিত্রের বহু হৃদয়কাড়া গানের গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী সুরের ভুবন ছেড়ে চলে যান ৯ অগাস্ট। ৬৮ বছর বয়সী এই সুরস্রষ্টা ক্যান্সারের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন।

একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায’, প্রথম বাংলাদেশ- আমার শেষ বাংলাদেশ, ভালোবাসা যতো বড়ো জীবন তত বড় নয়, দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়, হয় যদি বদনাম হোক আরো, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টা’, সুখে থাকো ও আমার নন্দিনীসহ কালজয়ী অসংখ্য গানে পেছনের কারিগর আলাউদ্দিন আলী।

১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখেন তিনি, আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে বেহালাবাদক হিসেবে। সেসব দিনে আনোয়ার পারভেজসহ প্রখ্যাত অনেক সুরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আলাউদ্দিন আলী। চলচ্চিত্রের সংগীতে বেহালা বাজাতে গিয়ে তার সংগীত পরিচালনার আগ্রহ তৈরি হয়।

১৯৭২ সালে দেশাত্মবোধক গান ‘ও আমার বাংলা মা’ গানের মাধ্যমে জীবনে প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। গোলাপী এখন ট্রেনে চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৯ সালে, সুন্দরী সিনেমার জন্য ১৯৮০ সালে এবং কসাই ও যোগাযোগ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৮৮ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া ১৯৮৫ সালে শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আলাউদ্দিন আলী। খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত পদ্মা নদীর মাঝি চলচ্চিত্রেও তিনি সংগীত পরিচালনা করেছেন।

মুর্তজা বশীর

বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যতম নক্ষত্র হিসেবে বিবেচিত মুর্তজা বশীর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ আগস্ট চিরবিদায় নেন।

বাংলার জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছোট সন্তান মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ অগাস্ট। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, প্রতিবাদে মুর্তজা বশীর ছিলেন অগ্রভাগে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন তিনি।

‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’, ‘কালেমা তাইয়্যেবা’, ‘পাখা’ শিল্পী মুর্তজা বশীরের আঁকা উল্লেখযোগ্য সিরিজ। তিনি ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’ নামে একটি শিল্পধারার প্রবর্তক। এছাড়াও ফিগারেটিভ কাজে পূর্ব পশ্চিমের মেলবন্ধনে তিনি স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন।

চিত্রকলায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক, ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদক পেয়েছেন মুর্তজা বশীর।

সি আর দত্ত

মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত ৯৩ বছর বয়সে ২৫ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান। তিনি বাসায় পড়েগিয়ে ব্যথা পেয়েছিলেন, পরে অস্ত্রোপচার করলেও আর জীবনে ফিরতে পারেননি।

বীর উত্তম সি আর দত্ত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামেরও নেতা ছিলেন তিনি।

সি আর দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি মেঘালয়ের শিলংয়ে। পরে তার পরিবার স্থায়ীভাবে চলে আসে হবিগঞ্জে। তিনি ১৯৫১ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে পুরস্কৃত করেছিল।

একাত্তরে ছুটিতে থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম মহাপরিচালক করা হয় তাকে। পরে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গঠনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন সি আর দত্ত।

রাহাত খান

প্রবীণ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক রাহাত খান ৮০ বছর বয়সে ২৮ অগাস্ট মারা যান। তিনি হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন।

দীর্ঘদিন দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করা রাহাত খান সর্বশেষ দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

‘অমল ধবল চাকরি’, ‘ছায়াদম্পতি’, ‘শহর’, ‘হে শূন্যতা’, ‘হে অনন্তের পাখি’, ‘মধ্য মাঠের খোলোয়াড়’, ‘এক প্রিয়দর্শিনী’, ‘মন্ত্রিসভার পতন’, ‘দুই নারী’, ‘কোলাহল’ এর মত উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ তার হাত দিয়েই এসেছে।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে রাহাত খান একুশে পদক পান। তার আগে ১৯৭৩ সালে পান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।

কিশোরগঞ্জে জন্ম নেওয়া রাহাত খানের সাংবাদিকতার শুরু ১৯৬৯ সালে দৈনিক সংবাদে। পরে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। সেখানে সহকারী সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন।

আবু ওসমান চৌধুরী

স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানী আবু ওসমান চৌধুরী ৮০ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৫ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী; তার স্ত্রী নাজিয়া খানম রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে খাবার ও পানীয়, টাকাপয়সা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ পাহারা দেওয়ার মতো কাজ করেন সাহসিকতার সঙ্গে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞ অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হয়, আবু ওসমান তখন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের চতুর্থ উইংয়ের কমান্ডার হিসেবে চুয়াডাঙ্গার দায়িত্বে।

পরদিন সকালে তিনি কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছান এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে একদল সৈনিককে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরে তাকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলে আবু ওসমান চৌধুরী এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর সিপাহীদের অভ্যুত্থানের সময় একদল সেনসদস্য আবু ওসমান চৌধুরীকে হত্যার জন্য তার গুলশানের বাড়িতে হামলা করে। বাড়িতে না থাকায় তিনি সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও নিহত হন তার স্ত্রী। জিয়াউর রহমানের আমলে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয় তাকে।

পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আবু ওসমান চৌধুরী। তিনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যানের পদেও ছিলেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবু ওসমান চৌধুরীকে বিজেএমসির চেয়ারম্যান করা হয়। পরে তিনি চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পান।

স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে আবু ওসমান চৌধুরীকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে সরকার।

জিয়াউদ্দিন তারেক আলী

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি এবং সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি জিয়াউদ্দিন তারেক আলী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭ সেপ্টেম্বর মারা যান।

একাত্তরের যে গানের দল বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল, সেই দলের সদস্য ছিলেন তারিক আলী। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে উঠেছে, তিনি তাদেই একজন।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলিন পরিষদ ও ছায়ানটের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

কে এস ফিরোজ

অভিনেতা কে এস ফিরোজ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ বছর বয়সে ৯ সেপ্টেম্বর মারা যান।

ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া খন্দকার শাহেদ উদ্দিন ফিরোজ অভিনয় করতে এসে কে এস ফিরোজ নামে পরিচিত হন। অভিনয়ে আসার আগে সেনাবাহিনীতে ছিলেন তিনি।

অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে থিয়েটারের ‘কিং লেয়ার’ মঞ্চ নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে পরিচিত পান তিনি। ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’, ‘রাক্ষসী’সহ আরও বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটকে দেখা গেছে তাকে।

তিনি মঞ্চ এবং ছোট ও বড় পর্দায় যুগপৎ অভিনয় করেছেন; নাট্যদল থিয়েটারের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি টিভি বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন তিনি।

টিভিতে তার অভিনীত প্রথম নাটক ‘দীপ তবুও জ্বলে’। পরে ‘লাওয়ারিশ’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বড়পর্দায় যাত্রা করেন কে এস ফিরোজ। আবু সাইয়িদের ‘শঙ্খনাদ’, ‘বাঁশি’, মুরাদ পারভেজ’র ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘বৃহন্নলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

সাদেক বাচ্চু

অভিনেতা সাদেক বাচ্চু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে ১৪ সেপ্টেম্বর মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

ডাকবিভাগের সাবেক কর্মকর্তা সাদেক হোসেন বাচ্চু টেলিভিশনে অভিনয় করে নাম কুড়িয়ে ১৯৮৫ সাল চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। ‘রামের সুমতি’র মাধ্যমে যাত্রা শুরুর পর বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। খল চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে দর্শকদের কাছে পেয়েছেন আলাদা পরিচিতি।

২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য খল চরিত্রে সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সাদেক বাচ্চু।

শাহ আহমদ শফী

হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ‘বড় মাদ্রাসা’ হিসেবে পরিচিত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী শত বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে ১৮ সেপ্টেম্বর মারা যান।

দেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ভিত মজবুত করতে তার ভূমিকা এবং দেওবন্দের অনুসারী আলেমদের কাছে আহমদ শফী ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র, তাকে ডাকা হত ‘বড় হুজুর’ বলে।

দেওবন্দের পাঠ্যসূচিতে পরিচালিত দেশের অন্যতম পুরনো এ কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।

শেষ বয়সে নিজের মাদ্রাসায় কর্তৃত্ব হারিয়েছিলেন আহমদ শফী; শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগের একদিন বাদেই তার মৃত্যু হয়। তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় তার পরিবারের পক্ষ থেকে।

নওশেরুজ্জামান

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় নওশেরুজ্জামান ৭০ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর জীবনের মাঠ থেকে বিদায় নেন।

৭০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু খেতাব পাওয়া এই খেলোয়াড়।

১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জে জন্ম নেওয়া নওশেরুজ্জামান ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৬৭ সালে রেলওয়ের হয়ে। এরপর ওয়ারী, ফায়ার সার্ভিস, ওয়াপদা ঘুরে ১৯৭৫ সালে যোগ দেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ১৯৭৮ থেকে ৮০ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ওয়ান্ডারার্সে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে খেলা নওশেরুজ্জামান পরে বাংলাদেশের জার্সিতে খেলেছেন ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। ফুটবলের মতো ক্রিকেটের আঙিনাও মাতিয়েছিলেন তিনি। মোহামেডান, ভিক্টোরিয়া ও কলাবাগানের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন ১৭ বছর।

মাহবুবে আলম

বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ৭১ বছর বয়সে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সংক্রমণমুক্ত হলেও সুস্থ হয়ে আর ফিরতে পারেননি তিনি।

মাহবুবে আলম ২০০৯ সালে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদে নিয়োগ পান। তারপর মৃত্যু অবধি ওই পদে ছিলেন। পদাধিকার বলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সর্বোচ্চ আদালতে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মাহবুবে আলম। এছাড়া সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলা পরিচালনাও করেন তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মামলায়ও যুক্ত ছিলেন মাহবুবে আলম। আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

তিনি এক মেয়াদে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং এক মেয়াদে সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

রশীদ হায়দার

কথাশিল্পী ও নজরুল ইন্সটিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক রশীদ হায়দার ৭৯ বছর বয়সে গত ১৩ অক্টোবর মারা যান। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

রশীদ হায়দারের জন্ম পাবনার দোহারপাড়ায়। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার জনপ্রিয় সিনে ম্যাগাজিন চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন রশীদ হায়দার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে তিনি অবসরে যান। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে গ্রন্থ ‘স্মৃতি: ১৯৭১’, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দালিলিক গ্রন্থ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে রশীদ হায়দারের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০ এর বেশি। তিনি ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকের ‘কিংকর’ চরিত্রে অভিনয়ও করেন। বড় ভাই জিয়া হায়দার ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ গঠন করলে রশীদ হায়দার সেই দলে যুক্ত ছিলেন।

বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য সরকার ২০১৪ সালে রশীদ হায়দারকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তার আগে ১৯৮৪ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান।

মনসুর উল করিম

একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক মনসুর উল করিম ৭০ বছর বয়সে ৫ অক্টোবর মারা যান। তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।

১৯৫০ সালে রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করা মনসুর উল করিম ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে চারুকলায় স্নাতক শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পরে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে চাকরিজীবন শুরু করে দীর্ঘ ৪০ বছর সেখানে অধ্যাপনা করেন।

অবসরে যাওয়ার পর নিজের জেলা রাজবাড়ীর রামকান্তপুর স্বর্ণশিমুল তলায় তিনি গড়ে তোলেন ‘বুনন আর্ট স্পেস’ যার উদ্দেশ্য ছিল চিত্রশিল্পী গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ২০০৯ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত মুখ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ৮৫ বছর বয়সে ২৪ অক্টোবর চিরবিদায় নেন।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে আলোচিত ছিলেন তিনি। ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে অসুস্থ থাকা অবস্থায় তার স্ট্রোক হয়েছিল।

রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালে কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। ১৯৫৮ সালে এলএলবি করে কলকাতা হাই কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৬২ সালে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৭৩ সাল থেকে আপিল বিভাগে কাজ করছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল করা হয়েছিল তাকে। ব্যারিস্টার রফিক বিভিন্ন সময় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সমাজ ও মানবতার সেবায় তার হাত ছিল সবসময়ই উদারহস্ত। যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজ-মানবতার সেবায়। ১৯৯৫ সালে রফিক-উল হক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুবর্ণ ক্লিনিক; ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা ছিল তার। আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন।

কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত

সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সম্পাদক, কবি ও সাংবাদিক আবুল হাসনাত ৭৫ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১ নভেম্বর মারা যান।

ছায়ানটের কার্যকরী সংসদের সদস্য আবুল হাসনাত একসময় সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

আবুল হাসনাত লিখতেন মাহমুদ আল জামান ছদ্মনামে। ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, ‘কোনো একদিন ভুবনডাঙায়’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল’ আবুল হাসনাতের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তার প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য ও জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য। শিশু ও কিশোরদের জন্য তিনি লিখেছেন ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে’, ‘রানুর দুঃখ-ভালোবাসা’।

দীর্ঘ ২৪ বছর দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করা আবুল হাসনাত আমৃত্যু কালি ও কলমের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি চিত্রকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘শিল্প ও শিল্পী’রও তিনি সম্পাদক ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো মনোনীত হন।

ফুটবলার বাদল রায়

গত শতকের আশির দশকে মাঠ কাঁপানো ফুটবলার বাদল রায় লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২২ নভেম্বর চিরতরে বিদায় নেন।

জাতীয় দলের হয়ে ১৯৮১ থেকে ৮৬ পর্যন্ত খেলা বাদল মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত খেলেন। দলটির হয়ে জেতেন পাঁচটি লিগ শিরোপা। শুধু মোহামেডান নয়, জাতীয় দলেও বাদল রায় ছিলেন অপরিহার্য ফুটবলার। ১৯৮২ দিল্লি এশিয়াডে তার জয়সূচক গোল রয়েছে ভারতের বিপক্ষে। ইনজুরির জন্য বাদল রায়ের ক্যারিয়ার খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি।খেলা ছাড়ার পর মোহামেডানের ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাদল রায় খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের হয়ে ১৯৯১ সালে কুমিল্লার একটি আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীও ছিলেন তিনি।

রাম চাঁদ গোয়ালা

বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিন বোলিংয়ের পথিকৃৎ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কখনো খেলার সুযোগ হয়নি তার। এমনকি আইসিসি ট্রফিও নয়। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের কিংবদন্তি তিনি। সেই রাম চাঁদ গোয়ালা ১৯ জুন সকালে ময়মনসিংহে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেছেন।

১৯৬০ সালের দিকে ঢাকা লিগে অভিষেক গোয়ালার। এরপর ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে যান এই ক্রিকেটার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ বছর কাটান আবাহনী ক্রীড়া চক্রে। এছাড়াও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবসহ অন্যান্য ক্লাবের হয়েও খেলেন গোয়ালা। ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে তিনি ওয়েস্ট বেঙ্গলের বিপক্ষে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে জাতীয় দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সফরেও গিয়েছিলেন গোয়ালা।

সাংবাদিক মুনীরুজ্জামান

দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কলামনিস্ট খন্দকার মুনীরুজ্জামান ৭৩ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ২৪ নভেম্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতায় সাংবাদিকতার শুরু করেন। পরে রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী কলাম লেখক হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। দীর্ঘদিন দৈনিক সংবাদে কাজ করেন তিনি। ২০১৯ সালে তিনি প্রেস কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।

অভিনেতা আলী যাকের

ক্যান্সারের সঙ্গে চার বছরেরও বেশি সময় লড়াই করে ২৭ নভেম্বর চির বিদায় নেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আলী যাকের।

১৯৭২ সালের আরণ্যক নাট্যদলের ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব। মঞ্চে নূরলদীন, গ্যালিলিও ও দেওয়ান গাজীর চরিত্রে আলী যাকেরের অভিনয় এখনও দর্শক মনে রেখেছে। ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি পাথর’, ‘আজ রবিবার’এর টিভি নাটকে অভিনয় করেও তিনি জনপ্রিয়তা পান।

অভিনয়, নির্দেশনার বাইরে তিনি ছিলেন একজন নাট্যসংগঠক; পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন লেখালেখির সঙ্গে। নাটকে অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি এশিয়াটিকের দায়িত্ব নেন, মৃত্যুর সময় তিনি কোম্পানির গ্রুপ চেয়ারম্যান ছিলেন।

মো. বরকতউল্লাহ

একসময়ের জনপ্রিয় প্রযোজক এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. বরকতউল্লাহ এবছর ৩ আগস্ট করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

বরকতউল্লাহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন জনপ্রিয় প্রযোজক ছিলেন। বিটিভির জনপ্রিয় অনেক নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই গুণী ব্যক্তিত্বের নাম। তাঁর নির্মিত তুমুল জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে আছে ‘সকাল-সন্ধ্যা’, ‘ঢাকায় থাকি’, ‘কোথাও কেউ নেই’। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাস করা এই প্রযোজকের স্ত্রী বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতউল্লাহ ও তাঁর মেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিজরী বরকতউল্লাহ। বরকতউল্লাহ দীর্ঘদিন বিটিভি ছাড়াও চ্যানেল ওয়ান, বাংলাভিশনের অনুষ্ঠানপ্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী ৭৫ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৩ ডিসেম্বর মারা যান।

১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া নূর হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব, বেফাকের সহসভাপতি ও আল-হাইয়া বোর্ডেরও কো-চেয়ারম্যান ছিলেন।

হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এ সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৫ নভেম্বর নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি হলে সেখানে তাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া

আবু তাহের

চিত্রশিল্পী আবু তাহের ৮৭ বছর বয়সে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। তিনি মস্তিষ্ক ও কিডনি জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

আবু তাহেরের জন্ম ১৯৩৬ সালে। তিনি ১৯৬৩ সালে ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিএফএ ডিগ্রি নেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদকসহ বিভিন্ন পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

২০১৭ সালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি।

কবি মনজুরে মওলা

কবি, প্রাবন্ধিক মনজুরে মওলা ৮০ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০ ডিসেম্বর মারা যান।

মনজুরে মওলা পেশাজীবনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ছিলেন। বাংলা একাডেমিতে তার তিন বছরের কার্যকালেই ‘একুশ আমাদের পরিচয়’ প্রত্যয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যা আজ বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপী চলা বই উৎসব।

ঐতিহাসিক বর্ধমান ভবন সংস্কার, প্রথম জাতীয় ফোকলোর কর্মশালার আয়োজন, আরজ আলী মাতুব্বর বা খোদা বক্স সাঁইয়ের মতো লোকমনীষাকে ফেলোশিপ দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ডেভিডসনের চিকিৎসাবিজ্ঞান কিংবা আনিসুজ্জামানের পুরনো বাংলা গদ্যের মতো বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছিলেন মনজুরে মওলা। ‘ভাষা শহীদ গ্রন্থমালার’ ১০১টি বই বাংলা একাডেমিতে তার অসামান্য কীর্তি।

নাট্যকার মান্নান হীরা

নাট্যকার, নির্দেশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা মান্নান হীরা ৫৫ বছর বয়সে ২৩ ডিসেম্বর মারা যান। তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন।

মান্নান হীরা বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি নাটকের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি আরণ্যক নাট্যদলের অধিকর্তা ছিলেন। মঞ্চ ও টিভির জন্য অসংখ্য নাটক লিখেছেন তিনি।

মান্নান হীরার উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে আছে ‘লাল জমিন’, ‘ভাগের মানুষ’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘সাদা-কালো’। ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’ মান্নান হীরা রচিত ও নির্দেশিত পথনাটক। ২০১৪ সালে সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ নির্মাণ করেন তিনি, সেটাই তার প্রথম চলচ্চিত্র।‘গরম ভাতের গল্প’ ও ‘৭১-এর রঙপেন্সিল’ নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় মান্নান হীরার হাতে।

আবদুল কাদের

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছিলেন, তার মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৬ ডিসেম্বর চিরবিদায় নেন অভিনেতা আবদুল কাদের। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকে সমান সক্রিয় আবদুল কাদেরকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের টিভি সিরিজ ‘কোথাও কেউ নেই‘র বদি চরিত্রটি।

ডিসেম্বরের শুরুতে শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিলে কাদের ভারতে যান চিকিৎসার জন্য। সেখানে তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। আর তা এখন নিরাময়ের বাইরে বলে জানিয়ে দেন চিকিৎসকরা। দেশে ফিরে আসার পর হাসপাতালে ভর্তি হলে ধরা পড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ।

কাদের অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শুরুতে অধ্যাপনায় যোগ দলেও পরে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করার পাশাপাশি নাটক নিয়েই মেতে ছিলেন। তার অভিনীত মঞ্চনাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘এখনও ক্রীতদাস’, ‘তোমরাই, স্পর্ধা’, ‘দুই বোন’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’। তিন হাজারের মতো টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ২০০৪ সালে তিনি ‘রং নাম্বার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু বিজ্ঞাপনের কাজও করেছেন তিনি।

দিনবদলবিডি/এইচ/জিএ


ট্যাগ :

আরো সংবাদ