মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

দেশে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে সৌরবিদ্যুৎ

প্রকাশের সময় : ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ৫:৪০ : পূর্বাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট:দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে আশা আর সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকছে এ খাতে। দিন দিন যে হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে তার বিপরীতে কমে আসছে শক্তির প্রচলিত উৎস। নিঃশেষ হয়ে আসছে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসও। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য শক্তি সৌরবিদ্যুৎ দেশে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।সর্বশেষ ময়মনসিংহে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গেল মঙ্গলবার (২২ ডিসেম্বর) প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে স্মার্ট ফটোভোলটাইক (পিভি) ইনস্টলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে এই কেন্দ্রের।হুয়াওয়ে বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আর্দ্র ও উষ্ণ জলবায়ুর দেশ বাংলাদেশে প্রতিবছর আড়াই হাজার ঘণ্টার বেশি সূর্যালোক থাকে। এটা বিবেচনায় রেখে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।এছাড়াও আগামী কয়েক মাসে আরো কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করবে। জোরেশোরে চলছে কয়েকটি কেন্দ্রের কার্যক্রম। এর বাইরে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিদ্যুৎখাতে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর বিদ্যুতের সরবরাহ বেড়ে যাবে।দেশে প্রথম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয় রাঙামাটিতে। গেল বছরের সেপ্টেম্বরে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান বাঁধসংলগ্ন এলাকায় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারিভাবে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার ঘটনা দেশে এটাই ছিল প্রথম। এর মধ্য দিয়ে দেশে সৌর বিদ্যুৎখাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

সূত্রমতে, ২০১০ সালের পর থেকে এখন অবধি দেশে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর ৪০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ২৩ কেন্দ্রের অনুমোদন বহাল থাকলেও সময়মতো কাজ করতে না পারায় অন্যদের বাতিল করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১১টি নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর কেন্দ্রের সঙ্গে সরকার বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিও (পিপিএ) করেছে।বর্তমানে দেশে ২০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা থাকলেও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ৬৩ মেগাওয়াট। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হিসাব মতে, দেশে প্রায় ৫৮ লাখ সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে। এ থেকে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাসাবাড়ি ও অফিসে সোলার হোম সিস্টেম বসিয়ে এসব বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।তথ্যমতে, বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মানুষ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করায় বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্টে (জিএসআর) বাংলাদেশ মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। তবে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েই চলছে।সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে মোটামুটি তিন একর জমিতে প্যানেল স্থাপনের প্রয়োজন হয়। তবে আবাদি জমিতে প্যানেল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা যেমন রয়েছে, তেমনি দেশে বড় আকারের পতিত জমিও খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে জমির অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

আবার চরে বা দুর্গম এলাকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলেও সঞ্চালনের জন্য দীর্ঘ লাইন নির্মাণ করতে হয়। এতে খরচ অনেক বেশি পড়ে। আবার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বিকেল পাঁচটার পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধা কেটে সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। অবশ্য সৌরবিদ্যুতের সুবিধা হলো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখলে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ যে বিপুল অর্থ দিতে হয়, সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা দিতে হবে না।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘অনেকগুলো বেসরকারি কোম্পানিকে সৌরবিদ্যুকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলেও জমি নিয়ে জটিলতায় তারা যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সে কারণে সরকার নিজেই সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র আসবে।’দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গেল মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেশে দেড় লাখ মেগাওয়াট বায়ু ও এক লাখ ৯১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিনিউবেল এনার্জি এজেন্সির (আইআরইএনএ) তথ্যমতে, দেশে সৌরবায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বছরে গড়ে ১৩ শতাংশ হারে কমছে। তাতে সৌরবিদ্যুৎ ঘিরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের বৈশ্বিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিনিউঅ্যাবেল এনার্জি এজেন্সির (আইরিনা) হিসাবে দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে প্রায় এক লাখ ৩৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। যার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতের কর্মসংস্থানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৬১ দেশের মধ্যে পঞ্চম। শীর্ষ দেশ চীন। এরপর দ্বিতীয় স্থানে জাপান, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র ও চতুর্থ ভারত। আর বাংলাদেশের পরে আছে ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও ফিলিপাইন।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ