বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

জাতির সর্বোচ্চ গৌরব ও অর্জন মহান বিজয় দিবস: লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য

প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ৬:৫৫ : অপরাহ্ণ

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য: ক্যালেন্ডারের পাতায় লিপিবদ্ধ হওয়া ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের এক আনন্দ ও গৌরবময় দিন। স্মৃতি ও বেদনার দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিতে এ দিনে আমাদের প্রিয় স্বদেশ দখলদারমুক্ত হয়। এ দিনেই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সারাবিশ্বে পরিচিতি পায় লাল সবুজের পতাকা। তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে এ দিবস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মূলত বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের সাফল্যের পেছনে বাঙালি জাতির দীর্ঘ দিনের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত।
বাঙালি জাতির ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পথ ধরেই বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খলা ভাঙতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দিনের পর দিন বাঙালির ওপর অত্যাচার নির্যাতন ও শোষণ চালাতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর শাসক গোষ্ঠী।
এই শাসন-শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি একে একে গড়ে তোলে আন্দোলন-সংগ্রাম। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।
এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ও নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির যে আন্দোলন শুরু হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
তিনি ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা’র আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে বাঙালি জাতি। ২৫ মার্চ কালো রাতে নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, শুরু করে গণহত্যা।
এই প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানম-ি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এরপর পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই যুদ্ধ। পাক হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে শুরু করে বর্বর গণহত্যা। গণহত্যার পাশাপাশি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা।
বাংলাদেশ পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অদম্য সাহস ও জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, নারীসহ সব শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের বাঙালি।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এগিয়ে আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মানুষ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন। সম্ভ্রম হারার দুই লাখের বেশি মা-বোন।
সর্বস্তরের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও এদেশের কিছু মানুষ, জাতির কুলাঙ্গার সন্তান পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষ নেয়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে তারা।
বাঙালি জাতির মরণপণ যুদ্ধ এবং দুর্বার প্রতিরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাজয়ের চূড়ান্ত পর্যায় বুঝতে পেরে বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে। এতেও সহযোগিতা ও সরাসরি অংশ নেয় এ দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী ও শন্তিকমিটির সদস্যরা।
অবশেষে বাঙালির দুর্বার প্রতিরোধের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়েই বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় নতুন স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ।
দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বহু কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জিত হয়। আর তাই তো প্রতিবছর সবিশেষ মর্যাদা নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয় বিজয় দিবস এবং এ বিজয়কে অক্ষুণœ ও সমুন্নত রাখা আমার আপনার সকলের কর্তব্য। সেই সঙ্গে দেশ ও জাতিকে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাজও আমাদের করতে হবে। কেননা জাতীয় জীবনে বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। এ দিবসটি বাঙালি জাতিকে ‘বীর বাঙালি’ হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি দিয়েছে। এ দিবসটি আমাদের বারবারই স্মরণ করিয়ে দেয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের কথা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ও বীরশ্রেষ্ঠদের কথা। সব অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিজয় দিবস আমাদের মনে প্রেরণা সৃষ্টি করে। প্রতিবছর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপনের জন্য আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে সর্বোচ্চ গৌরবের একটি অবিস্মরণীয় দিন।
জীবন দিয়ে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়। যতদিন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি জাতি থাকবে ততদিন এই দিনটির গুরুত্ব ও সম্মান অক্ষুণœ থাকবে।
বাংলাদেশ এবং ইউনেসকো এ বছর যৌথভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করার কথা থাকলে বিশ্বময় কোভিড ১৯ মহামারির কারণে জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও কাটছাট করা হয়েছে। তারপরেও যথাযোগ্য মর্যাদায় জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছি। এছাড়াও আমরা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলছে আর সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুতনয়া। এতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমরা তাই বিশ্বাস করি ।
তাই ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের এ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ বিজয় দিবসে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। কেননা ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ। এ দিবসটি তাই আমাদের হৃদয়ে যেমন আনন্দ-বেদনার সঞ্চার করে, তেমনি নতুন চেতনায়ও জাগ্রত করে। যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এ বিজয় আমরা অর্জন করেছি, সেই বিজয়কে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের দেশ গড়ার শপথ নিতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মরমী গবেষক।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ