মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Bangladesh Total News

আজ ১৬ ডিসেম্বর :এম এ কবীর

প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ৭:০৩ : অপরাহ্ণ

এম এ কবীর:আজ ১৬ ডিসেম্বর। শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ। বিজয়ের ৫০তম দিবস পালন করছি আমরা। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে ? ২৬ মার্চ আমরা পালন করব প্রিয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উৎসব। অভিবাদন প্রিয় বাংলাদেশ!
নিজ দেশে থেকে পরাধীনতার গ্লানি মুছে স্বপ্ন বুনে নতুন এক বাংলার।
কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন-
‘কোকিল, দোয়েল গান গেয়ে বলে,
আজ আমাদের বিজয় দিবস।
গোলাপ,বকুল বলে একসাথে
আজ আমাদের বিজয় দিবস।’
এ বিজয়ের কোনো তুলনা নেই। এই বিজয় রক্তে কেনা।
এ বিজয় শুধুই উদযাপনের নয়। হৃদয় দিয়ে আত্মোপলব্ধির।
বীরের রক্ত ¯্রােতÑ এ মাটির, এ জাতির গৌরব। চিরদিনের সম্পদ।
সেদিন শেখ মুজিবের এক সম্মোহনী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সব শ্রেণী-পেশার, সব সম্প্রদায়ের মানুষ- মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়েছিল, যা আগে কখনো হয়নি।
সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন Ñ ‘ আমাদের এই বাংলাদেশ, ধানের দেশ, গানের দেশ, বীরের দেশ, তেরো শত নদীর দেশ। আমাদের দেশ স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ।’
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লিখেছেনÑ ‘সে মুহুর্তে মনে হয়েছে, আমার দেশে কার্পাস ফুল ফুটেছে।’
কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ ‘১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১’ কবিতায় লিখেছেনÑ
পরিষ্কার মনে আছে সেই দিনটি।
টিয়ে পাখির মতো লাল-সবুজ পতাকায় পতাকায়
ভরে গিয়েছিল আমাদের শহর।’
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে দেশ। ইতিহাসের এমনই এক সন্ধিক্ষণে উপনীত এবারের বিজয় দিবস।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ‘স্বাধীনতা ৭১’ বইয়ে লিখেছেনÑ ‘১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়াজি বিষণœ পাংশু মুখে কাঁপা হাতে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন। তার কলমের কালিও সরছিল না। তাই তাকে অন্য একটি কলম দেয়া হলো। এই প্রথম তারা পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ স্বীকার করে নিলো।’
দিবসটির প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত হয়েছে নানা মাত্রা, নানা তাৎপর্য। জাতির চূড়ান্ত বিজয়ের দুর্লভ মুহুর্তগুলো নতুন প্রজন্মের ইতিহাসবোধ নির্মাণে নতুন উপাদান, নতুন দর্শন হাজির করেছে।
মেজর (অব:) এম এ জলিল ‘ বিজয় অভিযান’ নিবন্ধে লিখেছেনÑ ‘ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হলো। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ খুলনা সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার হায়াতের নেতৃত্বে দলটি আত্মসমর্পণ করল। তখন হাজার হাজার মানুষ আনন্দে আত্মহারা। পরাজিত ব্রিগেডিয়ার হায়াত মাথা নুইয়ে কম্পিত হাতে আত্মসমর্পণ দলিলে সই করলেন। কোমর থেকে বেল্ট খুলে মিত্রবাহিনীর কাছে অর্পণ করলেন। উৎফুল্ল জনতার ¯্রােতে আমি হারিয়ে গেলাম। জনতার দিকে শুন্য দৃষ্টি মেলে দিয়ে আমার স্বাধীন বাংলাকে প্রাণভরে দেখলাম।’
একটি মুক্তসমাজ গঠনের সংকল্পে বাঙালির এ উত্থান সে সময় খুব একটা স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না।
কবি আসাদ চৌধুরী ‘ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ বইতে লিখেছেনÑ ‘ অবরুদ্ধ ৯ মাস পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ৪ টা ২১ মিনিটে জেনারেল নিয়াজি রমনার রেসকোর্স ময়দানে জনতার ‘জয়বাংলা’ সেøাগানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন। এরপর সামরিক কায়দায় ধীরে ধীরে কোমর থেকে বেল্ট খুললেন, অস্ত্র সমর্পণ করলেন। পৃথিবীর মানচিত্রে বিশে^র অষ্টম বৃহৎ রাষ্ট্রের নাম লেখা হলো ‘বাংলাদেশ’। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, শত শত মায়ের অশ্রু দিয়ে গড়া এই দেশ বাংলাদেশ,আমার বাংলাদেশ।’
এই দেশের বিজয়ে,লাল-সবুজের পতাকার বিজয়ে সেদিন আমরা সম্মিলিতভাবে গেয়ে উঠি বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, আমাদের জাতীয় সংগীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’
চীন-আমেরিকার অব্যাহত সমর্থন পাকিস্তানকে উত্তরোত্তর আগ্রাসী করে তুলেছিল। বিভক্ত বিশ^ব্যবস্থা, কৌশলগত ভূ-রাজনীতি,আদর্শগত দ্বন্দ্ব দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধোত্তর পর্বটিকে জটিল করে রেখেছিল। শুধু ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য নয়, দেশের সম্পদ লুণ্ঠনেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বেপরোয়া মনোভাব ধরা পড়ে।
সম্পদ,সংস্কৃতি বা রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে কেবল বাঙালি বঞ্চিত হয়নি, ৭০-র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ’৬৫-র যুদ্ধে দেশের পূর্ব সীমান্তকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে বাঙালি সৈন্যদের পশ্চিম রণাঙ্গনে মোতায়েন করে পাকিস্তান প্রমাণ করে দিয়েছিল- বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে পূর্ববাংলা নিরাপদ নয়; বরং প্রতিবেশীর করুণার ওপরই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভর করে।
পক্ষান্তরে চাকরি, ব্যবসা বা রাষ্ট্রীয় সেবার সর্বত্র প্রবল হয়ে ওঠা তীব্র বৈষম্য
স্বাধিকার অর্জনের পথে জাতি এগিয়ে যায় একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের প্রত্যাশায়।
প্রবল পরাক্রমশালী বিশ^শক্তির মদদপুষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়া সহজসাধ্য ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সুসংগঠিত এ সংগ্রাম-শৃঙ্খলা, ঐক্য ও দৃঢ়তার অনন্য নজির স্থাপন করে একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হাজার বছরের স্বপ্ন সার্থক হয়ে ওঠে। তবে এ বিজয়ের মূল্যও নেহাত কম ছিল না। লোমহর্ষক এক গণহত্যার সাক্ষী হয় দেশ। ৩০ লাখ নর-নারী শহীদ হয়। নির্বিচার ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এমন বীভৎস হত্যালীলার নজির নেই বলেই মনে করেন অনেক গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী।
এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর আজ সঙ্গতভাবেই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দেশ। বিজয়ের গতি-প্রকৃতি, সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা রাষ্ট্রের চরিত্র- সবকিছুই আজ উন্মুক্ত বিশ্লেষণের টেবিলে। দৃষ্টির বৈচিত্র ভাবনার সীমাকে প্রসারিত করে। চিন্তার নতুন জগৎ তৈরি করে। আমরা যদি রাষ্ট্রের দৃশ্যমান অর্জনের দিকে নজর দিই, অবশ্যই সেখানে স্বস্তির বার্তা খুঁঁজে পাই। পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্র থেকে এ দেশের জন্ম হয়েছিল, সে রাষ্ট্রই এখন সক্ষমতার প্রায় সব সূচকেই আমাদের পেছনে।
মানব উন্নয়ন,নাগরিক সক্ষমতা, সবক্ষেত্রেই দেশ অনেক এগিয়ে। উন্নয়নের অনেক মাপকাঠিতে প্রতিবেশী ভারতও এখন আমাদের পাশে ম্লান। সমৃদ্ধি বুঝতে এখন বিশেষজ্ঞ লাগে না। পরিবর্তনের আভাস এখন সবখানেই। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র।
শিক্ষা-স্বাস্থ্য, শিল্প-কৃষি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, রাস্তা-ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য; এমন কী প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যরে প্রশ্নেও অগ্রগতির নমুনা আছে। দুর্নীতির বিস্তার ঘটলেও দুর্নীতি দমনে সাফল্য আছে। দেশ স্বাধীন না হলে ব্যক্তি,পরিবার, রাষ্ট্র কিংবা বিশ^ পরিসর; সর্বত্রই আমরা যে মর্যাদা,স্বাচ্ছন্দ্য ও সক্ষমতার নজির রেখে চলেছি, তা কখনই সম্ভব হতো না।
একটি বৈষম্যহীন মুক্তসমাজ গঠনের অব্যাহত আকাঙ্খার ফসল বাংলাদেশ। জাতি যখন মুক্তির ৫০ বছর পূর্তির অপেক্ষায় উন্মুখ, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে- রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা পুরণে কতটা সফল হয়েছে। আসলে রাষ্ট্রের যখন পথচলা আরম্ভ, প্রায় তখন থেকেই বিপত্তির শুরু। যে জাতি সর্বস্ব ত্যাগ করে হানাদারদের পরাজিত করল, সে জাতিকেই লড়তে হল নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে, লোভকে সামলে নিতে তাকে হিমশিম খেতে হল।
অন্যদিকে মুক্ত দেশের বাতাসে ছিল পোড়ামাটির গন্ধ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ভয়ংকর ধ্বংসের চিহ্ন, প্রতিহিংসার আগুনে ভস্ম খাদ্যগুদাম, বাড়িঘর, কল-কারখানা, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট; রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল শুন্য।
রাজনীতি ও অর্থনীতির চরিত্র বদলে যেতে লাগল। রাজনীতির ঐতিহ্য ও বিশুদ্ধতাকে কালিমালিপ্ত করার দম্ভোক্তি এলো প্রকাশ্যে। অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভ উসকে দেয়া হল।
ন্যূনতম সময়ে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের ইঁদুর দৌড় সমাজ থেকে যুগলালিত মূল্যবোধ উপড়ে ফেলতে লাগল। ঘোলাজলে মাছশিকারে তৎপর হয়ে উঠল ওৎ পেতে থাকা স্বার্থান্বেষী চক্র। উঠতি ধনিক শ্রেণি ও সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের এক অশুভ আঁতাত সমাজবুননের কাঠামোকেই পাল্টে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠল।
পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে এমন জায়গায় এসে পৌঁছাল, মত-পথ নির্বিশেষে প্রায় সব শাসকগোষ্ঠীই একপর্যায়ে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ ও অপ্রতিন্দ্বী করতে শুরু করল। মূল্যবোধ সম্পূর্ণ উপেক্ষিতই থেকে গেল।
মুখে যারা জাতীয়তাবাদের কথা বলে- ব্যক্তি পরিসরে তাদের জীবনচর্চার আদল হয়তো সম্পূর্ণই আলাদা। নিজের সন্তানদের এরাই ইংরেজি মাধ্যমে বিদেশি ভাবধারায় গড়ে তোলে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের জন্য অবশিষ্ট থাকে মাদরাসা, কারিগরি বা পরিচর্যাহীন সাধারণ শিক্ষা।
একথাও সত্যি- দেশে অর্থনীতির আকার বেড়েছে, বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। নাগরিকের সামর্থ্যও বেড়েছে। অঢেল বিত্তের মালিকও হয়েছে এক শ্রেণির মানুষ। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ- এ অর্থের বড় একটা অংশ জমা হচ্ছে বিদেশের ব্যাংকে। একদিকে ধনবৈষম্য, অন্যদিকে অর্থ পাচার। যেখানে দেশপ্রেম, জাতীয়তার বুলিকে ভীষণ ফাঁপা বলেই মনে হয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, আমাদের আচরণের ভঙ্গি দুর্বোধ্য স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ।
রাজনীতির মঞ্চে যেসব দেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারই আমাদের একমাত্র পুঁজি- বাণিজ্য, চিকিৎসা কিংবা অভিবাসনের স্বার্থে সেসব দেশই আমাদের সাধারণ গন্তব্য। চরম ভারতবিদ্বেষও চিকিৎসাসেবার জন্য ভারতনির্ভরতাকে পাশ কাটাতে পারে না। এদেশের কোনো নাগরিককে ডিভি লটারি বা ইউরোপীয় ভিসার লাইন থেকে সরাতে পারে না।
স্বাধীনতার পর প্রায় পঞ্চাশ বছর পার করলেও আমরা আদর্শগত, নীতিগত প্রশ্নে কতটা সৎ থাকতে পেরেছি, তা ভেবে দেখা দরকার।
পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর শতাব্দীর জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েছে, অসহায় মা-বোনদের অকথ্য নির্যাতন করেছে, দেশের শ্রেষ্ঠসন্তানদের বেছে বেছে খুন করেছে, আবার সেই ঘাতক বাহিনীরই এক লাখ সশস্ত্র সেনা কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করেছে।
আরও একটা প্রবণতা আমাদের ঘরোয়া রাজনীতিতে এখন দৃশ্যমান- তা হল, যে কোনো পথে টাকার মালিক হলেই রাজনীতি করার শখ জেগে উঠছে। সে রাজনীতির অর্থ সেবা নয়, ব্যবসার সুরক্ষা। সীমাহীন অর্থলিপ্সা এদের রাজনীতির বৃত্তে টেনে আনছে।
তারা মনে করে, রাজনীতি এখন সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র। বিকাশমান সমাজে এ এক নতুন অসুখ। হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা এ ধনিক গোষ্ঠীর পেছনে যদি রাজনৈতিক শক্তি যুক্ত হয়,তখন এরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
ঠিকাদারি, নদীদখল, হাট-বাজার বন্দোবস্ত, চাঁদাবাজি ইত্যাদি থেকে শুরু করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর সম্পদ দখল করার মতো অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত হয়ে পড়ে।
এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অনেক সময় ইতস্তত করে। ফলে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, জনস্বার্থও বিঘিœত হয়। এক সময় এরা বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের সাহস সঞ্চয় করে। সামাজিক দুর্বৃত্তায়নের এ ধারা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জন্য ভালো বিজ্ঞাপন নয়।
বাংলাদেশের ৫০তম বিজয় দিবস এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর এমন একসময়ে উপস্থিত, যখন পৃথিবী মোকাবেলা করছে এক মহামারী। এই করোনা মহামারীর ছোবলে বাংলাদেশে সাত হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। মহামারী সব কিছুই থমকে দিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যেভাবে উদযাপন করার কথা সেভাবে করা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীও একই সময়ে পড়েছে। বছরব্যাপী কর্মসূচি নিয়েও তা সেভাবে পালন করা যায়নি।
তবে বাংলাদেশের ৫০তম বিজয় দিবসের আনন্দ মুহুর্তে দেশের মানুষের জন্য বড় সুখবর হয়ে এসেছে পদ্মা সেতুর স্বপ্নপূরণ। প্রমত্তা পদ্মার ওপর দেশের দীর্ঘতম ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের এই সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি বসেছে। জোড়া লেগেছে পদ্মার দুই পাড়Ñ মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা। দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মা সেতু।
কেউ অস্বীকার করবে না, দেশ এগিয়েছে অনেকটা পথ। করোনাকালেও দেশের অর্থনীতি তার অন্তর্গত সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। তবে উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। নৈতিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রবাদের বিস্তার রুখে দেয়ার জন্য জনগণের ঐক্য চাই। জনগণের সার্বভৌমত্বই হল গণতন্ত্রের সারকথা। রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারিত হয় সাংবিধানিক মূল্যবোধের আলোকে। রাজনীতি, অর্থনীতি, বিদেশনীতি, গণতন্ত্র; এমন কী ধর্ম বিষয়েও আমাদের নৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত- সে বিষয়ে খোলামনে আলোচনা হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সরকারি দল-বিরোধীদলের সম্পর্কোন্নয়ন, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ^াসযোগ্যতা বৃদ্ধি; সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন- এসব বিষয়কে আলোচনার টেবিলে আনা জরুরি।
প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আত্মঘাতী নজির যেন ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা রাখতেই হবে। ঘৃণা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি একটি সম্ভাবনাময় দেশের ভবিষ্যৎকে যেন মেঘাচ্ছন্ন না করে, সেজন্য সব রাজনৈতিক দলকে মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে শুভবুদ্ধি ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে- এবারের বিজয় দিবসে এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

    এম এ কবীর
                                                 সাংবাদিক,কলামিস্ট,গবেষক।


ট্যাগ :

আরো সংবাদ